স্বল্প মূলধনের প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক ‘লম্ফঝম্প’

বল্প মূলধনের প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ছে মুন্নু জুট স্টাফলার; পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির শেয়ার চলতি বছরের ২৯ মার্চে ছিল ৭৮৭ টাকা। যা টানা বেড়ে গত ২৪ জুন দাঁড়ায় তিন হাজার ৬২৪ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে দুই হাজার ৮৩৭ টাকা বা ৩৬০ শতাংশ।

অন্যভাবে বলা যায়, তিন মাসের ব্যবধানে মুন্নু জুট স্টাফলারের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৬০ গুণ। অর্থাৎ একজন বিনিয়োগকারী ২৯ মার্চ কোম্পানিটির ১০ লাখ টাকার শেয়ার কিনে ২৪ জুন পর্যন্ত ধরে রাখলে এক মাসেই তা বেড়ে হয়েছে ৪০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ হিসাবে ১০ লাখ টাকা তিন মাস খাটিয়ে লাভ পাওয়া গেছে ৩০ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৪৬ লাখ টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা চার লাখ ৬০ হাজার।

শুধু মুন্নু জুট স্টাফলার নয় সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় অর্ধশত কোম্পানির শেয়ারের দাম এমন অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এ কারণে গত এক মাসে মোট ৪৩টি কোম্পানিকে নোটিশ পাঠিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসইসি)। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের অস্বাভাবিক দামের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদর সতর্ক করতে তথ্য প্রকাশ করেছে।

কিন্তু ডিএসইর সতর্ক বার্তাতেও কোনো কাজ হয়নি। ধারাবাহিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। যেমন মুন্নু জুটের বিষয়ে ডিএসই থেকে সতর্ক বার্তা প্রকাশ করা হয় ৪ জুন। ওই সময় কোম্পানিটির শেয়ার দাম ছিল দুই হাজার ৪৩৬ টাকা। অর্থাৎ ডিএসইর সতর্ক বার্তা প্রকাশের পর ১২ কার্যদিবসে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম আরও এক হাজার ১৮৮ টাকা বেড়েছে।

স্বল্প মূলধনের আরেক প্রতিষ্ঠান বিডি অটোকার। গত ২৮ মে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ১০৯ টাকা। যা টানা বেড়ে ২ জুলাই দাঁড়ায় ৩৯৯ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৬ গুণ।

এ হিসাবে গত ২৮ মের আগে যেসব বিনিয়োগকারীর কাছে বিডি অটোকারের ১০ লাখ টাকার শেয়ার ছিল, তিনি যদি ওই শেয়ার ধরে রাখেন তাহলে সেগুলোর দাম এখন ৩৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা এক মাস খাটিয়েই লাভ পাওয়া যাচ্ছে ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের এমন অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণে গত এক মাসে চারবার সতর্ক বার্তা প্রকাশ করেছে ডিএসই। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ তিন কোটি ৮৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা ৩৮ লাখ ৬২ হাজার ৫১২টি।

একই অবস্থা মডার্ন ডাইংয়ের ক্ষেত্রেও। গত ২৯ মে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ১৯০ টাকা। যা টানা বেড়ে ২ জুলাই দাঁড়ায় ৩৯৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়েছে ২০৫ টাকা বা ১০৮ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন এক কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা ১৩ লাখ ৬৮ হাজার।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে সেসবের সিংহভাগই স্বল্প মূলধনের প্রতিষ্ঠান। এর পেছনে কারসাজি আছে। পরিকল্পিতভাবেই একটি চক্র এসব শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উচিত এসব কোম্পানির দাম কেন বাড়ছে তা খতিয়ে দেখা।

তারা বলছেন, স্বল্প মূলধনের হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার সংখ্যা কম। ফলে গুটিকয়েক বিনিয়োগকারী সম্মিলিতভাবে বাজারে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের অস্বাভাবিক চাহিদা সৃষ্টি করতে পারেন। বর্তমানে হয়তো তেমন ঘটনাই ঘটছে। যে কারণে বাজার মন্দা থাকলেও স্বল্প মূলধনের কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।

এদিকে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়ে ডিএসই থেকে নোটিশ পাঠানো হলে জবাবে প্রতিটি কোম্পানিই জানিয়েছে যে, তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। তবে কিছু স্বল্প মূলধনের কোম্পানির বিষয়ে বাজারে গুঞ্জন রয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো পরিশোধিত মূলধন বাড়াবে।

শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ার কারণে গত এক মাসে ডিএসই থেকে একাধিকবার নোটিশ পাঠানো হয়েছে এমন কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- লিবরা ইনফিউশন, বিডি অটোকার, মুন্নু জুট স্টাফলার, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্ট, ফার্মা এইড, সাভার রি-ফ্যাক্টরিজ, জিকিউ বলপেন, বিডি ল্যাম্প, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, পপুলার লাইফ, অ্যাপেক্স স্পিনিং ও আজিজ পাইপ।

এছাড়া একবার করে নোটিশ পাঠানো হয়েছে- কোহিনূর কেমিক্যাল, সমতা লেদার, আরামিট সিমেন্ট, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর, কে অ্যান্ড কিউ, ইমাম বাটন, জিল বাংলা সুগার মিল, সোনালী আঁশ, এমবি ফার্মা, কুইন সাউথ টেক্সটাইল, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, ফু-ওয়াং ফুড, আইটিসি, প্রাইম টেক্সটাইল, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, উসমানিয়া গ্লাস, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন, জেএমআই সিরিঞ্জ, কেপিসিএল, কেপিপিএল, আরএসআরএম, অ্যাটলাস বাংলাদেশ, সাফকো স্পিনিং, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, মুন্নু সিরামিক, শ্যামপুর সুগারমিল, এইচআর টেক্সটাইল, স্টাইল ক্রাফট, মডার্ন ডাইং ও নর্দান জুট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ  বলেন, ‘গত এক মাসে স্বল্প মূলধনের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম প্রায় ডাবল হয়েছে। এর কারণ বাজারে বিনিয়োগকারীদের ছোট একটা অংশ জুয়া খেলছে। বাজারের এ পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনে বসে থাকা উচিত।’

‘ভালো অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম এখনও অনেক কম। লম্ফঝম্প না করে, এখানে লাভ, ওখানে লাভ- এমন ছোটাছুটি না করে মৌলভিত্তির শেয়ার কেনাই ভালো।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক রকিবুর রহমান  বলেন, ‘স্বল্প মূলধনের কোম্পানির শেয়ারের দাম হঠাৎ হঠাৎ অস্বাভাবিক হারে বাড়া বাজারে সব থেকে খারপ ও দুর্বল দিক। বাজারে ভালো ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ না করে, যেসব কোম্পানির মূলধন কম সেগুলো নিয়ে কিছু লোকজন গেম খেলছে। ওরা শেয়ারের দাম বাড়িয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব কোম্পানি শেয়ার নিয়ে খেলাধুলা করে তাদের কর্মকাণ্ড দেখলে বোঝা যায়। দেখা যাচ্ছে আজ একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ১২০০ টাকা। এরপর এটা হয়ে যায় ১৫০০ টাকা, তারপর ২৪০০ টাকা। এরপর আবার ১২০০ টাকায় চলে আসে। এগুলো বোঝা যায়। এসব শেয়ার যারা কেনাকাটা করছে, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে এমন কাজে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।’

‘নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ বিষয়ে আরও সতর্ক এবং এসব শেয়ারের বিষয়ে খুবই কঠোর হতে হবে’- যোগ করেন তিনি।