প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত, তবুও বিমানের ৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রায় ১৪ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বিমানের মেকানিকসহ সাতজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে চারজন বিমানকর্মী। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের আবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটি সত্য তবে কে বা কারা ঘটিয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। তাই আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর হাকিম আহসান হাবীবের আদালতে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করেন মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক সরওয়ার হোসেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়েছে।

অব্যাহতি সুপারিশের আসামিরা হলেন বিমান বাংলাদেশের এয়ারক্রাফট মেকানিক এমরানুল ইসলাম, আবু সালেহ, আক্তারুজ্জামান, জুনিয়র টেকনিশিয়ান ওসমান গনি, জনৈক আব্বাস আলী, নুরুন্নবী ও ইউনুস আলী।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং লাইন মেইনটেন্যান্সের ডিউটি রোস্টার ও অন্যান্য ডিউটি তালিকা পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হন যে, মামলার আসামি বিমানের মেকানিক এমরানুল ইসলাম ও কর্মচারী ওসমান গনি অজ্ঞাতনামা সহযোগীদের সহায়তায় স্বর্ণগুলো পাচার করার পরিকল্পনা করছিলেন। এমনকি মামলার আসামি এমরানুলকে রিমান্ডে নেয়া হলে বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশনের বেশ কিছু স্বর্ণ চোরাচালানি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম জানান।’

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘সাক্ষীদের জবানবন্দি, আসামিদের বক্তব্য এবং প্রাপ্ততথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, বিমানের বডির বিভিন্ন অংশে স্বর্ণের বার গোপনভাবে রাখা ও পুনরায় গ্রহণ করা সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই কাজটি ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার যে সকল টেকনিশিয়ান থাকেন তাদের পক্ষে সম্ভব।’

‘চোরাচালানিরা যাত্রীবেশে বিমানে অবস্থান করে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ এবং সুযোগ মতে স্বর্ণবার বুঝিয়া নেয় ও কাস্টমস চেকিং এড়িয়ে নিরাপদে বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করে। তাই এই মামলার বাদী ঘটনার সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার দুই সদস্যের নাম উল্লেখ করে তাদের ঘটনার সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য কিংবা প্রযুক্তিগত কোনো প্রমাণাদি ছাড়া কেবলমাত্র ধারণার বশবর্তী হয়ে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। মামলায় গ্রেফতারকৃতরা কেউও ঘটনার সঙ্গে জড়িত বিষয়টি স্বীকার করে নাই। মামলাটি তদন্ত করে আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ ও সাক্ষ্য পাওয়া যায় নাই। মামলাটি তদন্তকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত আদেশ-উপদেশ অনুসরণ করে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ঘটনার পরিত্যক্ত প্রায় ১৪ কেজি স্বর্ণবারের মালিক কে বা কাহারা এবং কাদের মাধ্যমে পাচার হতো তা উদঘাটন করা যায় নাই। মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ও সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। তাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা যায় নাই।’

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক সরওয়ার হোসেন  বলেন, প্রাথমিকভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আসামিদের শনাক্ত করা হলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে।

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি বিস্তারিত দেখবো। যদি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো হয় তাহলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেবো।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের (ফ্লাইট নং-০৪৬) মাধ্যমে পাচারের উদ্দেশে ১২০টি স্বর্ণবার (১৩ কেজি ৯৮৪ গ্রাম) আসে। গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে শুল্ক গোয়েন্দার একটি টিম বিমানের টয়লেটের নিচে থেকে এই স্বর্ণের বারগুলো উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত সার্কেল এয়ারপোর্টের সহকারী কর্মকর্তা আবুল হোসেন বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি করা হয় মেকানিক এমরানুল ইসলাম ও কর্মচারী ওসমান গনিকে।