প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর যা ভাবছে রাজনৈতিক দলগুলো

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অধীনে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নয় সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো। এসব রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতাদের ভাষ্য, বর্তমানে গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাই ত্রুটিপূর্ণ। দলীয় সরকারের অধীনে যেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো কম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হচ্ছে না, সেখানে যে নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন রয়েছে সেই নির্বাচন প্রভাবমুক্ত কতটা আশা করা যায়? সদ্য অনুষ্ঠিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা থাকলে এসব নির্বাচন নিয়ে এত প্রশ্ন ওঠার সুযোগ ছিল না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যে দৃশ্য দেখা গেছে জাতীয় নির্বাচনে তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না।

আওয়ামী লীগের শরিক নয়, এমন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মতে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার প্রথম শর্ত হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন এবং নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা। নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া দেশে কোনও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ জুলাই) সংসদ ভবনে সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে। সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে।’ দলীয় এমপিদের এই বিষয়টি মাথায় রেখে সেভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে পরিষ্কার বলে দিতে চাই, আপনি কোন আধ্যাত্মিক ক্ষমতার জোরে জানতে পারলেন, আপনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে আসবে? আপনি তো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে লোহার সিন্দুকে আটকে রেখেছেন। বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না।’

দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনও পরিবেশ নেই দাবি করে রিজভী বলেন, ‘বেগম জিয়াকে ছাড়া বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে না। প্রধানমন্ত্রী মনে হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে খুলনা-গাজীপুর মার্কা নির্বাচনকে বুঝিয়েছেন। শেখ হাসিনার অধীনে কোনও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি বা হবেও না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে।’

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের পরদিন শুক্রবার (৬ জুলাই) সংবাদ সম্মেলনেও রিজভী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন ইস্যুতে দলের আগের অবস্থানই তুলে ধরেন।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই। এর আগে সংসদ বাতিল, মন্ত্রিসভা বাতিল এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ করতে হবে। এইকসঙ্গে অবাধ-সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচনে যেন সবাই ভোট দিতে পারে, সব দল অংশ গ্রহণ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ওই খুলনা-গাজীপুরে সিটিতে যে মডেলে শান্তিপূর্ণভাবে পুলিশ-প্রশাসন দিয়ে ঘেরাও করে সিল মারার নির্বাচন, তা বন্ধ করতে হবে।’

নির্বাচনকালীন সরকারের জন্য গঠনের আগে প্রধানমন্ত্রীকে সব দলের সঙ্গে আলোচনা উদ্যোগ নিতে হবে দাবি করে জেএসডি সভাপতি বলেন, ‘তখন সব দল তাদের প্রস্তাব দেবে কাদের দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যায়। একইসঙ্গে আগামী নির্বাচনের আগে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সংস্কার করতে হবে। কারণ, বর্তমান নির্বাচন কমিশন খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনে মাধ্যমে প্রমাণ করেছে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম  বলেন, ‘অন্যদলগুলোর পক্ষ হয়ে প্রধানমন্ত্রী কীভাবে বললেন, নির্বাচনে সবাই অংশ গ্রহণ করবে? এটা কীভাবে তিনি জানলেন?’

তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনের আগে নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য কতগুলো প্রস্তাবনা দেবো আমরা। সংখ্যা অনুপাতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু করতে হবে। নির্বাচনে টাকা, পেশিশক্তি, প্রশাসনিক কারসাজি বন্ধ করতে হবে। প্রার্থীদের জামানতের টাকা কমাতে হবে। আমরা শুনছি, জামানতের টাকা নাকি ৫০ হাজার করে দেবে। গার্মেন্টস শ্রমিক ও দিনমজুর কি ৫০ হাজার টাকা জামানত দিতে পারবে? দেশের শতকরা ৯৫ শতাংশ মানুষ প্রার্থী হতে পারবে না জামানতের টাকার জন্য। এগুলো পরিবর্তন করতে হবে।’

আগামী নির্বাচনের আগে বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে দাবি করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় সেটা প্রমাণ হয়েছে খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই এই নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে।’

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক  বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে সব দল অংশ গ্রহণ করবে বলে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা তার রাজনৈতিক বক্তব্য। দেশে বর্তমানে অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশে নেই। সরকার এখনও দমন-নিপীড়ন করে চলছে। এই পরিবেশের উন্নতি করতে হবে।’

তিনি বলেন, “সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনি কেন্দ্রে যে অধিকার পাচ্ছে, বিরোধী সব রাজনৈতিক দল ও মানুষের জন্য একই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা যে নিপীড়নের উৎস রচনা করছেন, অনতিবিলম্বে এটা বন্ধ করতে হবে। সব রাজনৈতিক দল ও মানুষকে আস্থায় নিতে হবে। এটা ছাড়া যদি ‘৫ জানুয়ারি মার্কা’ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, এটা শুধু সরকারের জন্য নয়, গোটা দেশবাসীর জন্য আত্মঘাতী হবে।’

কোনও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না উল্লেখ করে সাইফুল হক বলেন, “নির্বাচনের সময় একটি ‘তদারকি সরকার’ গঠন করা দরকার। নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে। তাহলে নির্বাচন কমিশন তদারকি সরকারের ভূমিকা পালন করতে হবে। এ জন্য যদি সংবিধান সংশোধন করা দরকার হয় তা করতে হবে। এটাকে আমরা কোনও বাধা মনে করছি না।’

ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আমহাদ  বলেন, ‘আমরা আগামী নির্বাচনের অংশ গ্রহণের সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সারাদেশে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ারও প্রস্তুতি রয়েছে। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নির্ভর করছে নির্বাচনকালীন পরিবেশের ওপর। যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ থাকে তাহলে আমরা নির্বাচনে অংশ নেবো। আর যদি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো পরিবেশের সৃষ্টি হয় তাহলে দলের সূরা সদস্যের বৈঠক করে তখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো কি করবো না।’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক  বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছি আমরা। দলের প্রার্থীরাও সেই অনুযায়ী নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এখনও নির্বাচনে প্রায় পাঁচ-ছয় মাস বাকি আছে। সময় ও নির্বাচনের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবো।’