এবার বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের নতুন কৌশল

ভোটের কথা বিবেচনায় রেখে এবার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে চায় সরকার। জনসাধারণের কাছে ভোট চাইতে যাওয়ার আগেই সরকার চায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও দৃশ্যমান করতে। আর উন্নয়ন দৃশ্যমান করতে সময় মাত্র ৬ মাস। তাই সরকার নতুন কৌশল নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, সব কিছু ঠিক থাকলে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদের ১১তম সাধারণ নির্বাচন হবে। যদিও বর্তমান সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হবে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি।  সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। সেই হিসেবে ও সরকারের বিভিন্ন মহলের আগাম বক্তব্য অনুযায়ী ডিসেম্বরেই হবে জাতীয় নির্বাচন। সে বিবেচনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসই হচ্ছে বর্তমান সরকারের মেয়াদ। বাকি ৬ মাস (১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন) নির্বাচিত নতুন সরকার বাজেট বাস্তবায়ন করবে।

সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই ৬ মাসের মধ্যেই বাস্তবায়ন করতে চায় বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই একটি কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে। যে কাঠামোতে সরকারি খাতের অর্থ খরচের নীতিমালা অনেকটাই সহজ করা হয়েছে। সরকারি অনেক নিয়মের কারণে দেশের উন্নয়ন খাতের অর্থ খরচে নানা জটিলতা তৈরি হয়। যে জটিলতার কারণে অর্থ খরচ করা যায় না। এবার সে জটিলতা অনেকটাই সহজ করা হয়েছে। ফলে আগে কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থ খরচের টাকা আগাম উঠানো না গেলেও এখন উঠানো যাবে।

এছাড়াও আগে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের অর্থ খরচের পর অডিট না করে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় করা যেতো না। কিন্তু এবছর বিশেষ কাঠামোর আওতায় প্রকল্প ব্যয়ের প্রথম কিস্তির টাকায় সম্পন্ন করা কাজের অডিট বাকি রেখেই দ্বিতীয় কিস্তির টাকা উঠানো যাবে। সাধারণত অডিট ছাড়া প্রকল্পের অর্থ ছাড় করা হয় না। এবছর বাজেট বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে কিছু সময়ের জন্য অডিটের এই বাধ্যবাকতায় ছাড় দেওয়া হচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আহরণ সংক্রান্ত জটিলতারও কারণেও অর্থ ছাড়ে বিলম্বিত হয়। এমন যাতে না হয় সেজন্য প্রয়োজন হলে ঋণের টাকা থেকেও উন্নয়ন বাজেটে টাকার জোগান দেওয়া যাবে বলেও কাঠামোতে বলা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এডিপির অধীনে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতিশীল করতে অর্থ ছাড় সহজ করা হয়েছে। অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করা হয়েছে। সরকারের চলমান আর্থিক সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের অর্থ অবমুক্তি ও ব্যবহার নির্দেশিকায়’ এ সংশোধনী আনা হয়েছে। আগের পরিপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে মন্ত্রণালয়/বিভাগ/অধিদফতর/পরিদফতর/অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের জিওবি অংশের বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক ছাড় করার বিধান রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রকল্প পরিচালকদের অর্থ ছাড়ের অনুমোদন গ্রহণে দীর্ঘ ২/৩ মাস লেগে যায়।

সংশোধনীতে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়/বিভাগ থেকে বিভাজন আদেশ জারি এবং অর্থ ছাড় করার প্রয়োজন হবে না। প্রকল্প পরিচালকরা বাজেট বরাদ্দের আলোকে জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকে সরাসরি অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের সব পৌরসভা, সব সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদের কাছে নিজ নিজ এলাকার অগ্রআধিকার প্রকল্পসমূহের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে সেসব  প্রকল্প বা উন্নয়নমূলক কাজ দ্রুত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে জনগণের কল্যাণে কার্যকর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকেও গুরুত্ব দিয়ে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ তদারকির জন্য জেলা প্রশাসকদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র আরও জানায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সব কার্যক্রমের অর্থ বাকি না রেখে সময় মতো এবং মাসের অর্থ মাসে পরিশোধ বা সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। সেখানে মূল এডিপির আকার ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৬ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যয় হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি  অর্থবছরের মূল এডিপি’র মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়া হবে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। আর উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ৬০ হাজার  কোটি টাকা। মূল এডিপি’র বাইরে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দ ৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটের ছোট প্রকল্পগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এখন থেকেই সময় নষ্ট না করে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। যেসব প্রকল্প চলমান আছে, নতুন বছরেও বরাদ্দ আছে সেগুলোকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি হারে বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘জাতীয়নির্বাচনের কারণে কোনও উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে না। তবে আগামী অর্থবছরে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা আরএডিপি আর হবে না।’