২৯ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার নেই

স্টাফ রিপোর্টার : ভোলা সদরের টাউন কমিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটিতে নবম ও দশম শ্রেণী মিলে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৫ জন। আগামী বছর ও তার পরের বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থী এসব শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান বিষয়ে হাতেকলমে শিক্ষা দেয়ার জন্য বিদ্যালয়টিতে কোনো বিজ্ঞানাগার নেই। এ চিত্রেরই পুনরাবৃত্তি একই উপজেলার মাসুমা খানম মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চর নোয়াবাদ মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ ভোলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই। শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে বিজ্ঞান শেখানোর জন্য বিজ্ঞানাগার নেই এগুলোর কোনোটিতেই।

নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার মিয়ারহাট উচ্চ বিদ্যালয়েও দেখা গেছে একই অবস্থা। ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। এরপর পেরিয়ে গেছে ৭১ বছর। সুদীর্ঘ এ সময়ের মধ্যেও কোনো বিজ্ঞানাগার স্থাপিত হয়নি বিদ্যালয়টিতে। যদিও বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা নবম শ্রেণীতে ৩৫ ও দশম শ্রেণীতে ৪০ জন।

দেশে এমন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলোয় শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোয় পাঠদান করা হলেও হাতেকলমে শেখানোর জন্য স্থাপন করা হয়নি কোনো বিজ্ঞানাগার। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য বলছে, দেশের মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২৯ শতাংশেই এখনো কোনো বিজ্ঞানাগার স্থাপন করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান দুটোই সমান অপরিহার্য। শ্রেণীকক্ষে তত্ত্বীয় বিষয়ে পাঠদান করা গেলেও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের জন্য বিজ্ঞানাগার থাকাটা আবশ্যক। সে হিসেবে বলা যায়, শুধু বিজ্ঞানাগারের অভাবে বিজ্ঞান শিক্ষায় ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব থেকে যাচ্ছে দেশের ২৯ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।

ব্যানবেইসের সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০১৭ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে (নবম ও দশম) বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯ লাখ ৮১ হাজারেরও বেশি। কিন্তু বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকায় এর বড় একটি অংশই বিজ্ঞান বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকার চিত্রটি খুবই হতাশাজনক। আমরা একদিকে বলছি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাব। অন্যদিকে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করছি না।

অবকাঠামো দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলেমেয়েরা বিজ্ঞান বিষয়ে অতি সামান্য ধারণা লাভ করে থাকে। মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি হয় মাধ্যমিক ধাপে গিয়ে। যদিও এ ধাপটিতে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, বিজ্ঞান শিক্ষায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব ও পর্যাপ্ত ভৌতকাঠামো না থাকা।

বিজ্ঞান শিক্ষার দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে সেভ দ্য চিলড্রেনের এক গবেষণায়ও। বেসরকারি এ উন্নয়ন সংস্থাটির অর্থায়নে পরিচালিত ‘চাইল্ড পার্লামেন্ট’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকা এবং ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞানের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জরিপের আওতাধীন মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ বলেছে, তাদের কোনো ব্যবহারিক ক্লাস হয় না। এছাড়া ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছে, বিজ্ঞানাগারের জন্য তাদের অতিরিক্ত ফি পরিশোধ করতে হয়।

সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিজ্ঞানাগার স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানালেও তা পূরণ হচ্ছে না। এ বিষয়ে ভোলার চর নোয়াবাদ মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে নবম-দশম মিলে ৬৫ জন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করছে, যদিও তাদের জন্য কোনো বিজ্ঞানাগার নেই। উপজেলা শিক্ষা অফিসে এ বিষয়ে বারবার জানানো হয়েছে। তবে আশ্বাস ছাড়া কোনো প্রাপ্তি নেই। বিজ্ঞান শিক্ষার এ অবকাঠামো দুর্বলতার প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। গত দুই দশকে বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমতে দেখা গেছে। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান শাখায় শিক্ষার্থী ছিল মোট শিক্ষার্থীর ৪২ দশমিক ৮১ শতাংশ। অথচ ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৮ দশমিক ৯৭ শতাংশে। দুই যুগ সময়ের ব্যবধানে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি এ অনাগ্রহের প্রভাব পড়েছে পরবর্তী ধাপগুলোয়ও। পরের ধাপগুলোয় তা ক্রমাগত হারে কমছেই। সে তুলনায় বাণিজ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী ছিল মোট শিক্ষার্থীর ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। অথচ ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৭ দশমিক ২৬ শতাংশে।

সবশেষে এ প্রভাব গিয়ে পড়ছে উচ্চশিক্ষায়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ে ২০১৩ সালে বিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী কমেছে আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। চিকিৎসায় কমেছে ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। প্রকৌশলে উত্তীর্ণের হার এ সময় বাড়লেও তা খুব বেশি নয়, মাত্র ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। অথচ এ সময়ে সামাজিক বিজ্ঞানে স্নাতক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। একইভাবে ২০১৩ সালে মানবিকে স্নাতক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী বেড়েছে ২১, ব্যবসায় প্রশাসনে ৭২ দশমিক ৭৫ ও আইনে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান বলেন, বিজ্ঞানাগার ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষার পূর্ণতা আসে না। বিজ্ঞান শিক্ষায় হাতেকলমে শেখানোর ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার থাকাটা অপরিহার্য। আমাদের কাছে বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানাগার না থাকার বিষয়টি জানানো হয়। আবার অনেকেই বলেন, বিজ্ঞানাগার আছে কিন্তু যন্ত্রপাতি ও উপকরণ নেই। এ সমস্যা সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের সব বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হলে বিজ্ঞানাগার সংকটের সমাধান হবে।