দেশের আর্থিক খাতে সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে

বিশেষ প্রতিবেদন: আর্থিক খাতে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন বেড়েছে।বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শুধু ২০১৬-১৭ অর্থবছরেই ২ হাজার ৩৫৭টি সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন সংঘটিতে হয়েছে। যেখানে ২০১৭ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক লেনদেন হয়। এ সময় প্রায় ২৫০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন বেশি জমা হয়।

অন্যদিকে এর আগের অর্থবছরে সন্দেজনক লেনদেনের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬৮৭টি। যার মাত্র ১২১ টি লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে, যা অস্বাভাবিক লেনদেনের মাত্র ৫ শতাংশ। এত কমসংখ্যক লেনদেনের তদন্ত হওয়ায় বেশির ভাগ বড় অপরাধ আড়ালেই থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ জানান, ‘আর্থিক লেনদেন বাড়ছে, অনিয়মও বাড়ছে। এ কারণে আগের চেয়ে বেশি অভিযোগ হচ্ছে। তবে এসটিআরের মাত্র ৫ শতাংশ তদন্ত হলে তা খুবই নগণ্য। এর মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র আসবে না।’

তিনি আরো বলেন,‘সংস্থাটি নতুন করে কাজ শুরু করেছে, তাই জনবল ও প্রশিক্ষণের অভাব আছে। আন্তর্জাতিক রীতি মেনে যেহেতু পৃথক সংস্থা করা হয়েছে, তাই প্রশিক্ষণ ও জনবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে।’

সেইসাথেখ সরকার যেভাবে ব্যাংকমালিকদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, এ কারণেও সংস্থাটির কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

ঘুষ-দুর্নীতি, জঙ্গি বা সন্ত্রাসে অর্থায়ন, মানব পাচার, চোরাচালান, মুদ্রা জাল করা থেকে যেকোনো অপরাধের মাধ্যমে অর্থ আয়, অর্থ পাচার ও বেআইনি কোনো লেনদেনকে সাধারণভাবে মানি লন্ডারিংয়ের আওতায় আনা হয়। এসব ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন হলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, শেয়ারবাজারের ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিএফআইইউতে রিপোর্ট করে। যাকে সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) বলা হয়। এসব প্রতিবেদন ধরে তদন্ত করে বিএফআইইউ। এরপর ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন সংস্থায় প্রেরণ করে।

বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিএফআইইউ দুর্নীতি দমন কমিশনে ৭৩টি, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) ৩৮টি, ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটে ৯টি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ১টি প্রতিবেদন পাঠায়। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুর্নীতি নিয়ে ৬৯টি, প্রতারণার ৪৭টি, জালিয়াতির ১১টি ও সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদে অর্থায়ন নিয়ে ১১টি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সংস্থাটি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে অর্থায়নের কারণে ২০টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করে সংস্থাটি।

যোগাযোগ করা হলে বিএফআইইউর প্রধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মো.রাজী হাসান জানান, ‘আমাদের কাছে যেসব সন্দেহজনক প্রতিবেদন আসে, তার সবই বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে সন্ত্রাসে অর্থায়ন-সম্পর্কিত ঘটনা তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। আমরা ৫ শতাংশ প্রতিবেদন তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট সংস্থায় পাঠিয়েছি। অন্য অভিযোগগুলো জমা আছে, যেকোনো প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা যাবে।’

এসময় রাজী হাসান নিজেদের কাজকে বিদেশী সংস্থার চেয়ে অগ্রগামী বলে মনে ম্তেব্য করেন। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশগুলো ২-৩ শতাংশ অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট সংস্থায় প্রেরণ করে। সেই তুলনায় আমরা তাদের থেকে বেশি অভিযোগ তদন্ত করেছি।’