নথি জালিয়াতি করে বাড়ছে জামিনের ঘটনা

গাজীপুরের রাজাবাড়ী ইউনিয়নের চিনাশুকানিয়া গ্রামের এক শিশুকে (১০) ঘর ঝাড়ু দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে প্রবাস ফেরত প্রতিবেশী বিল্লাল ভূঁইয়া (৪৫)। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিচারিক আদালতে জামিন না পেয়ে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করে বিল্লাল। ওই আবেদনের সঙ্গে জাল নথি যুক্ত করে বলা হয়, ‘মেয়েটির বয়স ২১ বছর (প্রকৃত পক্ষে ১০)। দুজন একে অপরকে ভালোবাসে। মেয়ের মা সেটি পছন্দ করেন না। ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেনি। মেডিক্যাল সার্টিফিকেটে ধর্ষণের কোনও প্রমাণও নেই।’ ফলে হাইকোর্ট থেকে সহজেই জামিন পায় মামলার প্রধান এই আসামি।

কিন্তু এর কিছুদিন পরে হাইকোর্টের ওই জামিন আদেশ বিচারিক আদালতে পৌঁছালে জালিয়াতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতের নজরে আসে। ওই বিচারিক আদালত সুপ্রিম কোর্টকে জানান, আসামি বিল্লাল শিশুটির মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও হাইকোর্টের আইনজীবীর নাম জালিয়াতি করে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিল্লালকে দেওয়া জামিন আদেশ বাতিল করেন হাইকোর্ট।

 এভাবে নথি জালিয়াতি, জাল আদেশ তৈরি, প্রকৃত তথ্য গোপন করার মাধ্যমে নিম্ন আদালত থেকে নানা কৌশলে জামিনে মুক্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে আসামিরা। আদালতের মর্যাদা বিনষ্টে এ ধরনের ঘটনায় বিব্রত বিচারপতি ও আইনজীবীরা।

জামিনের আদেশ, আদালতের নথি জালিয়াতির মতো বিচারপতিদের সই জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে দেশের উচ্চ আদালতে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আসামিদের তাৎক্ষণিক গ্রেফতার, জামিন বাতিল, সিআইডির মাধ্যমে জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে জালিয়াতির ঘটনা খতিয়ে দেখতে হাইকোর্টের বেশ কয়েকটি বেঞ্চের নির্দেশনা রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, জামিন এবং নথি জালিয়াতির ঘটনায় এ পর্যন্ত ৪০টি মামলা করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। মামলাগুলো বর্তমানে বিচারাধীন ও তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপ্রিম কোর্টের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জালিয়াতের ঘটনা রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে হাইকোর্ট। জালিয়াত চক্রকে খুঁজে বের করতে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থাকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনজীবী ও বেঞ্চ অফিসারদের যোগসাজশে এসব ঘটনা ঘটছে কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকায় এরই মধ্যে রফিকুল ইসলাম নামে হাইকোর্টের এক বেঞ্চ কর্মকর্তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জাহিদ সারওয়ার কাজল  বলেন, ‘নথি কিংবা আদালতের আদেশ জাল করে অনেক আসামি কারামুক্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৮ মে তিন মামলায় জামিন জালিয়াতির অভিযোগে আইনজীবী মো. জালাল উদ্দিনকে সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সব আদালতে ছয় মাসের জন্য মামলা পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এসব জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব জালিয়াতির ঘটনা আমাদের আইনজীবীদের জন্য বিব্রতকর।’ এতে আইনজীবী ছাড়াও বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থার সংকট দেখা দেবে বলে মত দেন তিনি।

এদিকে জালিয়াতির ঘটনা রোধে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি একটি সাব কমিটি গঠন করেছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দুজন সহ-সভাপতি, দুজন সহযোগী সম্পাদক ও এক সদস্যসহ পাঁচ সদস্যের এই সাব কমিটি উচ্চ আদালতের জালিয়াতি রোধে কাজ করছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন  বলেন, ‘আদালত প্রাঙ্গণে জালিয়াতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার নয়। এর সঙ্গে আদালতের ও আইনজীবীদের মান-সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। মূলত নিম্ন আদালত থেকে নথি জাল হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আমরা যতটা পারছি তা প্রতিহত করার চেষ্টা করছি। এ পর্যন্ত হাইকোর্টে আমরা সাত ভুয়া আইনজীবীকেও শনাক্ত করে থানায় সোপার্দ করেছি। এরাই মূলত এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। তবু সর্বাবস্থায় জালিয়াতি রোধে আমরা অত্যন্ত সচেতন আছি।’