এলএনজি নিয়ে নতুন সংকটের আশঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে সংকটের আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। পাইপ লাইনে সরবরাহের আগে-আগেই বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করছেন তারা। তাদের মতে, এলএনজি আমদানির ফলে বিদ্যুৎ ও শিল্প বাণিজ্যের উৎপাদন ব্যয়ের পুরোটাই চেপে বসবে জনগণের ঘাড়ে। যা সইবার ক্ষমতা সাধারণ জনগণের আছে কিনা,  তা ভাবা হচ্ছে না। এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে দরের বিষয়টিও ভাবা হয়নি।

আন্তর্জাতিক বাজারে এই দর ওঠানামা করে। ফলে ভবিষ্যতে এই গ্যাসের দাম কী পরিমাণ বাড়বে, তারও হিসাব করা হয়নি বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সরকার এখনপর্যন্ত এলএনজি আমদানির ফলে কী পরিমাণ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, তার কোনও হিসাব করেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের জ্বালানি ব্যবহারের বড় একটি পরিবর্তন ঘটবে এলএনজি আমাদানির মাধ্যমে।

সরকারের পরিকল্পনায় আপাতত সংকট মোকাবিলার পুরোটাই এলএনজি আমদানির কথা বলা হচ্ছে। একবারে এতটা গ্যাস একসঙ্গে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানোর ঘটনা অতীতে আর ঘটেনি।বিষয়টি আশা জাগালেও গোল বেঁধেছে দর নিয়ে। স্পষ্টত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি বলছে ১৪২ থেকে ১৪৩ ভাগ দর বাড়াবে। একবারে এতটা জ্বালানির দরেরও বাড়ানো হয়নি কখনও। স্বাভাবিকভাবেই শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে পণ্যেরও দর বাড়বে। আর যেন দুর্ভোগ বাড়বে সাধারণ মানুষের। তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনও প্রতিষ্ঠান এখনও কোনও গবেষণার কথাও জানায়নি।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, আগামী ৪ জুলাই দেশের পাইপলাইনে এলএনজি সরবরাহ করা হবে। তবে সাগর উত্তাল থাকায় আরও কিছুটা দেরির কথাও বলছেন কেউ কেউ। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাগর বেশ উত্তাল। এখনও বলা যাচ্ছে না ৪ জুলাই এলএনজি পাইপ লাইনে দেওয়া যাবে কিনা। সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। এখন সব কিছু সাগরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।

গত ২৪ এপ্রিল এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালটি কাতার থেকে এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশে আসে। এরপর ১০ মে প্রথম দফায় এলএনজি সরবরাহের দিন ঠিক করা হয়। এরপর ২৫ অথবা ২৬ মে দ্বিতীয় দফায় আরও একবার এলএনজি সরবরাহের দিনক্ষণ ঠিক করা হলেও সরবরাহ শুরু করতে পারেনি এক্সিলারেট এনার্জি। এরপর জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ ৬ থেকে ১২ জুনের মধ্যে যেকোনও একদিন এলএনজি সরবরাহের দিন নির্ধারণ করা হয়।

তবে পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে সরবরাহ শুরু করা যায়নি।এক্সিলারেট এনার্জির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ত্রুটি সারিয়ে ২৫ জুন থেকে পাইপলাইনটি পরীক্ষা করা হচ্ছে।এখন পাইপলাইনটি সরবরাহের জন্য প্রস্তুত। এদিকে পেট্রোবাংলা বিইআরসির কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছে তাতে জুলাই মাসে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসার কথা।কিন্তু এখন এক্সিলরেট এনার্জির যে টার্মিনাল আছে তা সর্বোচ্চ ৪৬০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করতে পারে।বিইআরসির কারিগরি কমিটি মূল্যায়ন শেষে বলছে, জুলাইতে সর্বোচ্চ ২৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসতে পারে।পর্যায়ক্রমে বিইআরসি আগস্টে ২৮৫, সেপ্টেম্বরে ২৭৬, অক্টোবরে ৪৩৯, নভেম্বরে ৪২৫ ডিসেম্বরে ৪৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসবে বলে মনে করছে।

আগামী জানুয়ারিতে আবার ৪৩৯, একই মাত্রায় ফেব্রুয়ারিতে ৩৯৬, মার্চে সরবরাহ কমে ৪৩৯, এপ্রিলে আবার ৪২৫, মে তে ৪৩৯ এবং জুনে গিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুট  এলএনজি আসবে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। ফলে এক হাজার মিলিয়নের হিসাব দিয়ে যে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে, তাও ঠিক হচ্ছে না বলে মনে করছেন কমিশনের কর্মকর্তারা। এদিকে এই সময়ের মধ্যে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ারও  খুব একটা সম্ভাবনার বা সে অনুযায়ী কোনও পরিকল্পনা নেই জ্বালানি বিভাগের কাছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, ‘এলএনজি আমাদানির জন্য একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। দিনের পর দিন দেশে গ্যাস অনুসন্ধান উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়েছে।এখন বাড়তি ব্যয়ের চাপ সাধারণ মানুষের কাঁধে তুলে দেওয়া হচ্ছে।দেশের মানুষ আদৌও এই চাপ সইবার ক্ষমতা রাখে কিনা, তা বিচার করা হচ্ছে না।’

বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতির (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘ভয়াবহ এক সংকট তৈরি করা হচ্ছে এলএনজি আমদানি করে। প্রয়োজন ছিল দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো।কিন্তু পেট্রোবাংলা তা পারেনি।’ তিনি মনে করেন, ‘বাড়তি দর দিতে গিয়ে জনগণের নাভিশ্বাস উঠবে। এতে শিল্প ও বিদ্যুতের দামও ভবিষ্যতে বাড়বে।’

জ্বালানি বিশেষ ও পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘এলএনজির ওপর নির্ভর করে শিল্প ও বাণিজ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে তার প্রভাব পড়বে জনগণের ওপরই।গ্যাসের বাড়তি সুবিধা সাধারণ মানুষ পাবে না কিন্তু বাড়তি টাকা দিতে হবে তাদেরই। আগামী দিনে আরও এলএনজি আসবে। ফলে দাম আরও বাড়তে পারে। এই অব্স্থায় গ্যাসের দাম আগামীতে কত বাড়তে পারে এবং এই বাড়ার প্রভাব কী পরিমাণ সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।’