কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলা, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের কঠোর কর্মসূচি

সংবাদ সম্মেলনে বাধা দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হামলার ঘটনায় দেশব্যাপী ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। হামলায় গুরুতর আহত নুরুল হককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সারারণ শিক্ষার্থীরা।

খোঁজখবর নিয়ে জানা যাচ্ছে, হামলার ঘটনার প্রতিবাদে সারাদেশে কঠোর আন্দোলনে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে রবিবার থেকে সারা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন এবং অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সামাজিক মিডিয়ায় এ নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ পড়েছে।

এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু আন্দোলনকারীদের আরেকটি গ্রুপ আন্দোলন চালিয়ে যায়, অন্যেরাও এতে যোগ দেয়। সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। আন্দোলনকারীরা এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনন্দ মিছিলও করে। কিন্তু সেই ঘোষণার প্রজ্ঞাপন আড়াই মাসেও জারি হয়নি।

এর প্রেক্ষিতে পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলনে বাধা দিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের। এতে ১০ জনের মতো আহত হন। এর মধ্যে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এসময় গণমাধ্যমকর্মীসহ অনেকে এই ঘটনা ভিডিও চিত্র ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেন। সে সকল ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, এক দল যুবক সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুরসহ বেশ কয়েকজনকে বেধড়ক মারধর করছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটির নেতাদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের হাজী মুহাম্মদ মহসিন হলের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক আল আমিন রহমান, স্যার এএফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষার, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মেহেদী হাসান রনি ও ইমতিয়াজ বুলবুল হামলায় নেতৃত্বে ছিলেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বরাত দিয়ে ঢাবি প্রতিনিধি জানান, আহতরা হলেন, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর, ফারুক হাসান ও আরশ। হাসান আল মামুম বলেন, আহতদের মধ্যে নুরুল ও আরশকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

হাসান আরো বলেন, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সরকার কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি না করায় পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল। সকাল পৌনে ১১টার দিকে তাদের সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান, নুরুল হক নুরসহ নেতাকর্মীরা সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসময় ছাত্রলীগের ২০০-২৫০ জন নেতাকর্মী তাদের ওপর হামলা চালিয়ে চার জনকে আহত করে।

এদিকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যম কর্মীদের পাঠানো প্রতিবেদনে জানা যায়, শনিবার বেলা ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করার ঘোষণা দিয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। সে জন্য আন্দোলনকারীরা নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগেই কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হন। এ সময় সেখানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরাও আসেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী দাবি করেন, ‘নুরকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে সবচেয়ে বেশি মারধর করা হয়েছে। মারধরের হাত থেকে বাঁচতে তিনি উঠার চেষ্টা করলেও তাকে টেনে-হিঁচড়ে মারা হয়েছে। মারধরে অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী অংশ নেন।’

‘মারধরের একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কর্মচারীরা নুরকে গ্রন্থাগারের ভিতর নিয়ে গেলে সেখানে ঢুকেও তাকে মারা হয়।’

এদিকে হামলা ও মারধরের প্রায় এক ঘণ্টা পর দুপুর সোয়া ১২টার দিকে গ্রন্থাগার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের আবাসিক ছাত্র ও বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আরশা নামের একজন শিক্ষার্থী বেরিয়ে এলে তাকে গ্রন্থাগারের সামনের রাস্তায় ফেলে তাকে কয়েকজন মারধর করে। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আন্দোলকারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। কয়েকজনকে লাইব্রেরির সামনে রাস্তায় ফেলে পিটানোর দৃশ্যও দেখা যায় সেই ভিডিওতে।

এই ঘটনা তাৎক্ষণিক নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে, এর আগে শুক্রবার বিকেলে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁনকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক শীর্ষ নেতারা হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাসুদুল হোসেন জানান, কোটা সংস্কারের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে তাদের একটি সংবাদ সম্মেলন ছিল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে। সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ছাত্রলীগ তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন ছাত্র আহত হয়েছেন।