ইজিবাইক-অটোরিকশার অনুমোদনের পক্ষে সরকার, আপত্তি শ্রমিক সংগঠনের

সারাদেশে সড়কে দাপিয়ে বেড়ানো অনুমোদনহীন ইলেকট্রিক ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন দিতে চায় সরকার। তবে এ নিয়ে জোর আপত্তি রয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলোর। তারা বলছে, অবৈধ এ বাহনটির অনুমোদন দিলে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি এ সেক্টরে অরাজকতা বাড়বে। বাড়বে যানজটও। বৃহস্পতিবার (২৮ জুন) প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র বিষয়টি  নিশ্চিত করেছে।

বৈঠকে উপস্থিত জাতীয় রিকশা-ভ্যান-শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইনসুল আলী  বলেন, ‘বৈঠকে ইলেকট্রিক ইজিবাকই ও ব্যাটারিচালিত রিকশার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধিরা ইজিবাইকের বিপক্ষে মত দিয়েছি। বলেছি, এই বাহনগুলো সড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। চলাচলে এর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। যখন-তখন যে কেউ চাইলে বাহনগুলো রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছে। এর অনুমোদন না দিয়ে বরং কীভাবে বন্ধ করা যায় সে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘মহানগরীতে ৭৯ হাজার বৈধ রিকশা রয়েছে। অবৈধ রিকশা রয়েছে আরও অন্তত ১০ লাখ। এর মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এই রিকশাগুলো যদি অনুমোদন দেওয়া হয় তাহলে বৈধ লাইসেন্সধারী রিকশাগুলোতেও ব্যাটারি স্থাপনের অনুমোদন দিতে হবে। না হলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।’
বৈঠকে উপস্থিত অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ খোকন  বলেন, ‘বৈঠকে এই বাহনগুলোর বিষয়ে আমাদের অভিমত জানতে চাওয়া হয়। আমি জানিয়েছে, এর অনুমোদন দেওয়া উচিত হবে না। কারণ, বর্তমানে সারাদেশে ১০ লাখ ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এসব পরিবহনে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারি রয়েছে। বছরের মাথায় ব্যাটারিগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন এগুলো ধ্বংস করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই ব্যাটারিগুলো পরিবেশবান্ধব নয়। ফলে এ কারণে পরিবেশের দূষণ ঘটবে।’
তিনি বলেন, ‘রাস্তার চলাচলে এই বাহনগুলো ঘণ্টায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার গতিতে চলে। ব্রেক করলেও অনেক দূর গিয়ে থামে। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। তাছাড়া সড়কের বিশাল একটি অংশ দখল করে এই পরিবহনগুলো রাখা হয়। ফলে এর অনুমোদন দেওয়া হলে মহানগরীতে যানজট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। বিদ্যুতেরও ভয়াবহ অপচয় হবে।’
তবে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এই পরিবহনগুলোর বৈধতা দিতে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তবে বিআরটিএ সচিব জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। কারণ, মটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ মোতাবেক এই পরিবহনের অনুমোদন দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। এ নিয়ে আগে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতেও আমরা এই মতামত দিয়েছি। এ জন্য আইনের পরিবর্তন করতে হবে। তাছাড়া অনুমোদন দিলেও কে দেবে? সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন নাকি বিআরটিএ? অনুমোদন দেওয়া হলেও এর আকার-আকৃতি বা নকশা কেমন হবে? বিষয়টি আরও বিস্তর পর্যালোচনা করা উচিত। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে আলোচনা করা যেতে পারে। পরে কোনও সিদ্ধান্ত চাড়াই বৈঠক শেষ হয়।
বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ রিকশা মালিক লীগের সভাপতি আর এ জামানও একই অভিমত জানান বলে জানা গেছে।
আবার কেউ কেউ বলেছেন, সারাদেশে ইজিবাইকগুলো বিদ্যুতের চার্জে চলছে। এসব যানবাহনে বৈধ উপায়ে বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। তাছাড়া এই বাহনগুলোর নেই কোনও রেজিস্ট্রেশন বা ট্রেড লাইসেন্সও। এ জন্য এর অনুমোদন দিতে চাইছে সরকার।
সূত্র জানিয়েছে, গণপরিবহনের সংকটকে পুঁজি করে সারাদেশে সয়লাব হয়ে গেছে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল অবৈধ ইজিবাইক ও অটোরিকশায়। এ দুটি বাহনের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এর অধিকাংশই বিদ্যুতের অবৈধ বা চোরাই লাইন থেকে চার্জ দেওয়া হয়। এ কারণে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চুরি হয়ে যাচ্ছে। এসব পরিবহনের জন্য নেই সরকারি কোনও নীতিমালা বা আইন। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছে সরকার। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ চুরি ঠেকানো ও বৈধতা দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর চিন্তা সরকারের। বিষয়টি নিয়ে এর আগেও বিদ্যুৎ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে। প্রতিটি বৈঠকেই পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আপত্তি ছিল।
জানতে চাইলে বিআরটিএ সচিব শওকত আলী  বলেন, ‘ইলেকট্রিক ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, অবৈধ এই বাহনগুলোকে কীভাবে আইনের আওতায় আনা যায়। তাছাড়া আমরা বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে এ নিয়ে আইন-কানুনের ব্যাখ্যা দিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী, বিআরটিএ সচিব শওকত আলী, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।