‘আসন শঙ্কায়’ বিএনপির জাতীয় ঐক্য

বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার আগে রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্যের যে ডাক দিয়েছিলেন খুব শিগগিরই তার প্রতিফলন দেখা যাবে- এমন খবর দিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বেশ উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস যেন ফিকে হতে চলেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং আসন বিন্যাস নিয়ে ২০ দলীয় জোট নেতাদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, বেশকিছু দিন ধরে জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা স্ব স্ব আসনে নিজেদের মতো করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনে জোটের কাছে ৭০টি আসন চায় জামায়াতে ইসলামী। দলের নীতিনির্ধারকরা ৭০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতাও শুরু করেছেন। অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রে পাঁচজন করে সব মিলিয়ে দেড় শতাধিক নেতা জোটের মনোনয়নপ্রত্যাশী।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা দলগুলোকে নিয়ে বিএনপি যে জাতীয় ঐক্যের কথা বলছে সেখানে বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, নাগরিক ঐক্য, জেএসডিসহ কয়েকটি দলের নামও শোনা যাচ্ছে। এসব দলের প্রধানদের স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকায় বেশ প্রভাব রয়েছে। এক্ষেত্রে জোটে যে সব দল আছে তারা প্রত্যাশিত আসন পাবে না- এমন শঙ্কাও রয়েছে নেতাদের মধ্যে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ২৮ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য গঠনের কাজ চলছে। আমরা আশা করি, এটাতে সফল হওয়া যাবে। যদি সফল হওয়া যায় তাহলে ইনশাআল্লাহ আওয়ামী লীগ তিনদিনও ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।’

‘জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির কারণ আন্দোলনের জন্য। এটাই গণআন্দোলনের পথে নিয়ে যাবে।’

বিএনপির জাতীয় ঐক্য গঠন প্রসঙ্গে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ ন্যাপ’র চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি  বলেন, ‘জোটের একজন প্রশ্ন করেছিল যে জাতীয় ঐক্যের কথা আমরা শুনতে পাচ্ছি, সেটার অগ্রগতি কতদূর? বিএনপি মহাসচিব আমাদের অবগত করলেন যে, মোটামুটি ভালো অগ্রসর হয়েছে। অনেকের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। এটা তো জোট সম্প্রসারণ নয়, যুগপৎ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ।’

বিএনপির জাতীয় ঐক্য গঠনে ২০ দলের নেতারা আসন সংকটে পড়বেন কিনা, আপনারা কোনো চাপ অনুভব করছেন কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইস্যুভিত্তিক কিছু দলকে আমরা আন্দোলনে পাব। তাদের পাশে পাওয়ার জন্য বিএনপি কী করছে সে বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ হয়নি। আমরা জিজ্ঞাসাও করিনি। আসনের বিনিময়ে এমন কোনো সমঝোতা হচ্ছে কিনা- আমরা এমন প্রশ্নও রাখিনি।’

বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের চেয়ারম্যান মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস বলেন, ‘এখন জাতীয় ঐক্যে যারা আসবে তাদেরও তো কিছু আসন সরবরাহ করতে হবে। তা না হলে তারা আসবে নাকি? আমাদের আসনই বা কয়টা? বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কোনো সমস্যা হবে না।’

জোটের অন্য শরিক দলগুলো আসন সংকটে পড়বে বলে আপনি মনে করছেন কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অন্যদেরও তেমন অসুবিধা হবে না। জাতীয় ঐক্য গড়তে হলে সেক্রিফাইজ করতে হবে। আমি যদি সব নিতে চাই তাহলে তো কিছুই জুটবে না।’

বাংলাদেশ লেবার পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য নিয়ে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে কথা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়েছে। যথা সময়ে আপনারা দেখতে পাবেন।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য মানে সবাইকে ২০ দলীয় জোটে আসতে হবে- এমন নয়। আবার ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাবে- এমনও না। এখানে ২০ দলীয় জোটের বাইরে যারা আছেন তারা আসতে চান না বা আসার ক্ষেত্রে তাদের অনেক হিসাব-নিকাশ আছে। সেক্ষেত্রে একই দাবিতে অর্থাৎ বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে বা শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া যাবে না; এক্ষেত্রে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে সমমনা বা সংঘ বা আলাদা একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারে।’

সামনে নির্বাচন, এ অবস্থায় আপনারা যুগপৎ আন্দোলন, কর্মসূচি বা চলার কথা বলছেন। সেক্ষেত্রে আসন বিনিময়ের কোনো বিষয় আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ইরান বলেন, ‘দেখুন, নির্বাচনের কোনো রোডম্যাপ এখনও ঘোষিত হয়নি। এ কারণে আসন নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। তবে বিষয়টি ক্রমান্বয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং জোটে যথা সময়ে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। জোটের পক্ষ থেকেও আমাদের এ বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে।’

জাতীয় ঐক্য হলে ২০ দলের নেতাদের আসন সংকট তৈরি হবে কিনা- এমন প্রশ্নে ইরান বলেন, ‘আমার মনে হয় না কোনো সমস্যা তৈরি হবে। কারণ প্রতিটি বিষয়েই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান আছে। এ মুহূর্তে প্রধান টার্গেট হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।’

‘জাতীয় ঐক্য’ হলে আসন বিন্যাসের ক্ষেত্রে ২০ দলে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘তা তো কিছুটা হবেই। কারণ যে সব দলের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে তাদের তো কিছু আসন দেয়া লাগবে। এটাই স্বাভাবিক।’

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আবদুল মতিন সাউদ বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলন এবং আসন বিনিময়ের ব্যাপার তো এখানে থাকবেই। ’

তিনি বলেন, ‘শরিক দলে যারা উপযুক্ত, যাদের অবস্থান আছে তারা অবশ্যই নমিনেশন পাবেন। যারা উপযুক্ত নন, তারা তো চাইতে পারেন না। অযথা এতগুলো চাওয়ার তো যুক্তি নেই। আমার যতগুলো আছে আমি তো ওইভাবেই চাইব।’

‘আমরা তো সবাই বুঝি কোথায় কার, কেমন অবস্থান। কার দলের কী অবস্থান। ওইভাবে হবে।’

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাৎ সেলিম বলেন, ‘যে যেখানে যোগ্য, সেখানে তাকে মনোনয়ন দেয়া হবে। এভাবেই আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে। জেতার মতো অবস্থান যার থাকবে সেই নির্বাচন করবেন।’

‘আমরা ছয় বছর ধরে মামলা-মোকদ্দমা-হামলায় জর্জরিত, মামলা চালাতে প্রচুর অর্থব্যয় হচ্ছে। এখন কেউ এসে আমার এখানে আসন দাবি করে বসবে- এটা তো হতে পারে না। আমি তো কোনো ছাড় দেব না। এটা কেউ-ই করবে না।’

‘আমরা ঐক্য চাই, তবে সুবিধাবাদী কাউকে চাই না। ঐক্যে আসার আগেই যদি আসন নিয়ে ওই ধরনের কিছু হয় তাহলে ঐক্য ভেঙ্গে যাবে।’

‘যে যেখানে যোগ্য, বিজয়ী হতে পারবেন; সেখানে তিনিই মনোনয়ন পাবেন- এভাবেই কথা হয়েছে। জেতার মতো অবস্থান যার থাকবে সেই নির্বাচন করবে।’