স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি কী অর্জন করতে চায়?

স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোয় অংশ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ কয়েকটি দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনেই দলীয় প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক’ নানা ধরনের অভিযোগ করলেও ভোটযুদ্ধে দলীয় প্রার্থী দিয়েছে দলটি। এরমধ্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে একটি প্রশ্ন উঠেছে—একের পর এক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে দলটি কী অজর্ন করতে চায়?

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ তোলে বিএনপি। নির্বাচনি প্রচারণাকালে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার ওপর তিন দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর নির্বাচনের দিন দুপুরেই ভোটবর্জন করে দলটি। এতে পরবর্তী নির্বাচনগুলোয় অংশ নেওয়ার বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হলেও এরপরে অনুষ্ঠিত কুমিল্লা ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী দেয় বিএনপি। আর নির্বাচনে ভোট কারচুপি, প্রশাসনের দলান্ধতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনেছেন দলটির নেতারা। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ভোটের আগে-পরে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও ভোটকেন্দ্রে দলটির দুর্বলতা ছিল দৃশ্যমান। কেন্দ্রে এজেন্ট অনুপস্থিত, প্রচারণায় ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

গত ১৫ মে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন ও সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৬ জুন) অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কেন্দ্রে এজেন্ট নিয়োগে ছিল অনেক ঘাটতি। যৎসামান্য কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়া প্রচারণায়ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপস্থিতি ছিল অনেক। কিন্তু অভিযোগ, দলীয় দুবর্লতার পরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির আগ্রহ কেন?

দলের সিনিয়র নেতারা বলছেন, গত দুই বছর ধরে সারাদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সিটির নির্বাচনে হেরে গেলেও ‘আন্দোলনের অংশ’ হিসেবে দলীয় প্রার্থী মনোয়ন দিয়ে যাচ্ছে দলটি। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৬ জুন) গাজীপুর সিটি নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে বিএনপি। যদিও নির্বাচনের দিন দুপুরেই ভোট বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন দলীয় প্রার্থী।

বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের মূল্যায়ন, সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনে অভিযোগের পরও অংশ নেওয়ার মূল কারণ, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচনই সুষ্ঠু হয় না—এ অভিযোগ প্রমাণ করা। একইসঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু হবে না, এর একটি আগাম বার্তাও দেশ-বিদেশে পৌঁছে দেওয়া। এই দু’টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। তবে কোনও-কোনও নেতা বলছেন, যে কৌশলের কারণেই হোক না কেন, নেতাকর্মীদের কাছে দলীয় হাইকমান্ডের কৌশল সম্পর্কে বার্তা দেওয়া জরুরি। না হলে নেতাকর্মীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির  সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন  বলেন, ‘আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোয় অংশ নিয়েছি আন্দোলনের অংশ হিসেবে। প্রত্যেকটি নির্বাচনে কারচুপি, ভোটজাল হওয়ার পরও আমরা অংশ নিচ্ছি এ কারণে যে, বিশ্ববাসী-দেশবাসী দেখুক, শেখ হাসিনার অধীনে কেমন নির্বাচন হয়। আগামী নির্বাচন তিনি তার অধীনে কীভাবে করতে চান।’

মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, ‘বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণই হচ্ছে, বিদেশি পর্যবেক্ষকরা দেখছেন, কী ধরনের নির্বাচন হচ্ছে। আমরা না গেলে একতরফা হতো। এখন সবাই দেখছেন, বুঝতে সক্ষম হয়েছেন এই সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচনই সুষ্ঠু হয় না।’

সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা যদি মনে করেন, আগামী নির্বাচনেও তিনি ভোট কারচুপি করবেন, ক্ষমতায় যাবেন, যেতে পারেন। আমাদের লক্ষ্য তাদের অধীনে প্রত্যেকটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।’

বিএনপির একজন নির্ভরযোগ্য নেতা  জানান, ‘সম্প্রতি দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছেন। সেখানে আসন্ন সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন দলীয় প্রধান।’

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অনেক বেশি সক্রিয়। এক্ষেত্রে নির্বাচন বর্জন করলে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা চলে আসবে। একইসঙ্গে কোণঠাসা অবস্থায় দলীয় নেতাকর্মীরা ‘মানুষের সঙ্গে কমপক্ষে যোগাযোগ রক্ষা’ করতে পারছে। নির্বাচনি প্রচারণার মধ্য দিয়ে মূলত নেতাকর্মীরাও একে-অন্যের সঙ্গে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক ঝালাই করতে সক্ষম হচ্ছে। বিষয়টি উঠে আসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে আহমেদ আযমের আলাপেও।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েক বছরে উপজেলা, পৌর নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোয় ধারাবাহিকভাবে অংশ নিয়ে আসছে বিএনপি।

তবে দলটির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি, হামলা-মামলার কারণে ভোটের কার্যক্রমে নিয়মিতভাবে অংশ নিতে পারছেন না নেতাকর্মীরা। খুলনা সিটির মতো আজ (মঙ্গলবার) গাজীপুরেও বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, ‘গাজীপুর নির্বাচনে ভোটচুরি, গ্রেফতার, কেন্দ্র দখল সবকিছুই সংঘটিত হয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বহু কেন্দ্রের নির্বাচনি এজেন্টদের গ্রেফতার করা হয়েছে।’

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু  বলেন, ‘সরকার, প্রশাসনের বৈধ-অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে খালি হাতে কতক্ষণ লড়াই করা যায় বা সম্ভব? নেতাকর্মীরা লড়াই করছে, সংগ্রাম করছে। ধারাবাহিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বড় কারণ হচ্ছে, এই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রত্যেকটি নির্বাচনের চেহারা মানুষ দেখছে, পৃথিবী দেখছে। এই অনিয়ম করে কেউ-ই ছাড় পায়নি। এর মধ্য দিয়ে ফল আসবে।’

দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন দায়িত্বশীল বলছেন, ‘বিএনপির ৫ সিটিতে মেয়র ছিল। কী লাভ হয়েছে? সরকারপতনের আন্দোলন বা সংগঠন-কিছুতেই কোনও ফল আসে না। এইসব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হেরে গেলেও কোনও সমস্যা নেই। মূল ফোকাস জাতীয় নির্বাচন। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই নির্বাচনের জন্য কতটা প্রস্তুত বিএনপি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক  বলেন, ‘দলীয় হাইকমান্ডের কৌশল যাই হোক না কেন, নেতাকর্মীদের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়াসহ নেতাকর্মীদের সঠিক বার্তা না দিলে হিতে বিপরীত ঘটতে পারে বা যা পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তার ফল আসবে না।’

গাজীপুর সিটির নির্বাচনটিকে নতুন বিস্ময় বলে মনে করছেন জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, ‘গাজীপুরে একটা প্রকাশ্যে পুলিশ, র‌্যাব, প্রশাসন সবাই আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে।’

এমাজ উদ্দীন আহমদের ভাষ্য, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কার্যকারিতা হচ্ছে কিভাবে ভোটারদের মোবিলাইজড করা যায়। কিন্তু গাজীপুর নিয়ে বসতে হবে বিএনপিকে। নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।’

মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত ও রাজনৈতিক বিষয়ে নীতিনির্ধারণী বৈঠকে বসেছেন বিএনপির সিনিয়র অন্তত ১৫ জন নেতা।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার  বলেন, ‘বৈঠক শুরু হয়েছে। নানা বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।’ একটি সূত্র জানায়, আজকের বৈঠকের পর গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে বিএনপি দলীয় অবস্থান চূড়ান্ত করবে।

চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, আগামী কাল (বুধবার) বিকাল ৪ টায় বিএনপি-জোটের বৈঠক ডাকা হয়েছে। এর আগে সকাল সাড়ে এগারোটায় দলের চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর  সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন।