মহাখালীতে নোয়াখালীর ‘এমপিপুত্রের’ গাড়িচাপায় মৃত্যু

ঢাকার মহাখালীতে গাড়িচাপায় এক চালকের প্রাণহানির জন্য নোয়াখালীর সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরীর ছেলে শাবাব চৌধুরীকে দায়ী করেছেন দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী।

সাংসদদের বাসভবন ন্যাম ফ্ল্যাটের একজন নৈশপ্রহরীর কথায়ও মঙ্গলবার রাতের ওই দুর্ঘটনায় শাবাবকে দোষারোপ করা হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে শাবাবের পরিবার বলছে, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী গাড়িটি তাদের। কিন্তু ঘটনার সময় শাবাব গাড়ি ‘চালাচ্ছিলেন না’।

আর পুলিশ বলছে, ওই সময় শাবাব গাড়ি চালাচ্ছিলেন কি না সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। গাড়িটি উদ্ধারের পর পরীক্ষা করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে মহাখালীতে বিমানবন্দর সড়কে একটি গাড়ির ধাক্কায় ঘটনাস্থলে সেলিম ব্যাপারী (৫৫) নামের ওই ব্যক্তি মারা যান। তিনি তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক ছিলেন।

তাকে ধাক্কা দেওয়া গাড়িটি নোয়াখালী সদরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরীর স্ত্রী কামরুন্নাহার শিউলীর। এই সাংসদপত্নী নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

রাতে ওই ঘটনার পর শাবাবের গাড়ি অনুসরণ করে ন্যাম ভবনে গিয়ে দুর্ঘটনায় এই এমপিপুত্রের ‘সম্পৃক্ততার কথা’ জানতে পারেন বলে দাবি করেছেন একজন। এ বিষয়ে রাতেই কাফরুল থানায় গিয়ে সাংসদপুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

শামীম আশরাফি নামের ধানমণ্ডি এলাকার এই ব্যবসায়ী রাতের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, তারা দুইজন একটা খয়েরি রঙের টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়িতে ছিলেন। রাত ১০টার পরে বনানী পার হয়ে ধানমণ্ডি যাওয়ার পথে একটা সাদা অডি গাড়িকে একটা মটরসাইকেলকে অনুসরণ করতে দেখে কৌতূহলবশত তারাও তাদের পিছু নেন।

“এক পর্যায়ে গাড়িটি ন্যাম ভবনে ঢুকে পড়ে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলটি ঢুকে পড়ে। পরে আমরাও ঢুকে পড়ি। ন্যাম ভবনে প্রবেশ করার আগে গার্ডকে জিজ্ঞাসা করতেই সে জানায়, ওই গাড়িতে নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিমের ছেলে শাবাব চৌধুরী আছেন। তার পরনে হালকা এক রঙের শার্ট ও একটি প্যান্ট ছিল।

“গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি শাবাব চৌধুরী মটরসাইকেলের আরোহীর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তাকে কিল-ঘুষি মারতে চাইছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে ওকে মারছেন কেন প্রশ্ন করে নিজের পরিচয় দেই। শাবাব চৌধুরী মোটরসাইকেল আরোহীর ফোন কেড়ে নিয়ে ফোনের দাম দিতে চাইছেন কেন জানতে চাই।

“তখন শাবাব খুব স্বাভাবিক ও ভাবলেশহীনভাবে এগিয়ে এসে বলেন, একটা বাসের সাথে গাড়ির ধাক্কা লেগেছে। পরে মটরসাইকেল আরোহী বলেন, আপনার গাড়ির চাপায় একজন মারা গিয়েছে। তার ভিডিও ফুটেজও আমার কাছে রয়েছে। এরপর ওই যুবক শাবাবকে বলেন, তোমার ভুল হয়েছে। যিনি মারা গিয়েছেন তার পরিবারের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাও। তাদের ক্ষতিপূরণ দাও।

“কিন্তু শাবাব তাকে বলেন, আমরা সোসাইটির কোন লেভেল মেইনটেইন করি তা তো জানো। তোমরা চলে যাও। এমনটা হতেই পারে। এরপর মটরসাইকেলআরোহীকে উদ্দেশ করে উনি বলেন, ওর ফোনে ভিডিও আছে, তাই নিয়েছি। কত কোটি টাকা লাগবে বল, বিষয়টা তোমরা চেপে যাও।”

ওই সময় বরিশালের এক সংসদ সদস্যের ছেলে পরিচয় দিয়ে আরেক যুবক সেখানে গিয়ে শাবাবের পক্ষে ঘটনার মীমাংসা করতে চাইছিলেন বলে জানান তিনি।

শামীম মটরসাইকেলআরোহী যে যুবকের কথা বলেছেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তার বক্তব্য এসেছে টেলিভিশনের খবরে।

টেলিভিশন ফুটেজে তাকে বলতে শোনা যায়, “২৭ নম্বরের ওখানে ইউটার্ন নিয়ে আবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ওদের বাসায় ঢুকছে। বাসায় ঢুকেই সে বলেছে, গেট বন্ধ করে দাও, গেট বন্ধ করে দাও। আমি ওর গাড়ির পিছন পিছন ঢুকছি, যদি এক সেকেন্ডও দেরি করতাম তাহলে ঢুকতে পারতাম না।

“তারপর ছেলে বলছে যে, তোমার যত টাকা লাগবে দিব, ও কোনো ইস্যু না, তুমি অফ যাও। আমাকে ওর ফ্রেন্ড দিয়ে একটা ঘুষি মারছে, একটা লাথি মারছে।”

এক পর্যায়ে বন্ধুর সঙ্গে ন্যাম ভবন থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে কাফরুল থানায় যান জানিয়ে শামীম বলেন, “ওসিকে বিষয়টি জানালে তিনি বারবার আমাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করতে থাকেন। পুরো বিষয়টি নিয়ে আমাদের সাথে খারাপ আচরণও করেন। আমরা ৯৯৯-এ ফোন করেও ঘটনাটি পুলিশকে জানিয়েছি। তার সব ধরনের তথ্য-প্রমাণও আমাদের কাছে রয়েছে।”

তার এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে কাফরুল থানার ওসি সিকদার মো. শামীম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সুজন কর্মকারকে দুপুর থেকে বহুবার ফোন করলেও তারা ফোন ধরেননি।

এক পর্যায়ে থানার টেলিফোন অপারেটর আব্দুর রব জিজ্ঞাসায় বলেন, “রাত সাড়ে ১২টা-১টার দিকে আশরাফ নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তারা গাড়িটিকে ধাওয়া করেছিলেন, গাড়িটি সর্বশেষ ন্যাম ভবনের ভেতরে ঢুকে যায় এবং গাড়িতে এমপির ছেলে শাবাব ছিল।”

তার সঙ্গে কথা হওয়ার পরেও কাফরুল থানার ওসির বক্তব্য পেতে সন্ধ্যার পর আবার তাকে ফোন করা হয়। এ সময় ফোনে ওসি সিকদার মো. শামীম বলেন, “না। এ রকম কেউ রাতে থানায় আসেনি।”

পরে আগের রাতের ঘটনার বিষয়ে জানতে ন্যাম ভবনে গিয়ে সেখানে দায়িত্বপালনকারী প্রহরীদের কাছে খোঁজ নেওয়া হয়।

ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ব্লকের নৈশপ্রহরী নজরুল ইসলাম জানান, ভবনের ৬০২ নম্বর ফ্ল্যাটটি নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরীর নামে বরাদ্দ থাকলেও সেখানে গাড়িচালক ও গৃহকর্মীরা থাকেন। সাংসদের পরিবার থাকে ধানমন্ডিতে।

তিনি বলেন, “বুধবার রাতে ন্যাম ভবনের ৫ ও ৪ নম্বর ব্লকের মাঝামাঝি শাবাব সাহেবকে ৫-৬ জন ছেলে-মেয়েসহ দেখা যায়। সেখানে কোনো ঝামেলা হয়েছে বলে মনে হয়। পরে তাদের গাড়িচালক নুরুল আমিন বলেন, তিনি সেদিন গাড়ি নিয়ে বের হননি। সাবাব সাহেব গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন।

“ন্যাম ভবনের নিচে সাবাব সাহেবই গাড়ি রেখে যান। নুরুল আমিনকে বলি, আপনি গাড়িতে থাকলে তো সমস্যা হয়ে যেত।”

দুর্ঘটনার সময় এই নুরুল আমিনই ‘গাড়ি চালাচ্ছিলেন’ বলে দাবি করেছেন শাবাবের মা শিউলী।

তিনি বলেন, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন নুরুল আমিন নামে তাদের গাড়িচালক। উত্তরায় এক বান্ধবীর কাছে একটি পার্সেল পাঠিয়েছিলেন তিনি, সেটা নিয়ে যাচ্ছিলেন নুরুল আমিন।

নুরুল আমিন এখন কোথায়- তা জানতে চাইলে শিউলী বলেন, তারাও ওই গাড়িচালককে এখন ‘খুঁজে পাচ্ছেন না’।

ঘটনার বিষয়ে নুরুল আমিন ও শাবাব চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদ আহমেদ বলেন, “গাড়িটির মালিক নোয়াখালীর সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরীর স্ত্রী কামরুন্নাহার শিউলী। গাড়িটি কে চালাচ্ছিল সেটা আমরা নিশ্চিত না।

“গাড়িটি আটকের পর কে সেটা চালাচ্ছিল সেটা জানা যাবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিহত সেলিমের জামাতা আরিফ ভূঁইয়া বলেন, রাতে নিজের প্রতিষ্ঠানের গাড়ি জমা দিয়ে উত্তরখানের বাসায় ফিরতে বাসে উঠতে মহাখালীতে অপেক্ষা করছিলেন তার শ্বশুর। ওই সময় একটি গাড়ি তাকে ধাক্কা দেয়।

“পুলিশের মাধ্যমে খবর পেয়ে থানায় গিয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শুনতে পারি। তারা বলেছে, প্রথমে একটি সাদা জিপ গাড়ি শ্বশুরকে চাপা দেয়। গাড়িটি তখন তার দুই পায়ের উপর দিয়ে যায়, চাপা খেয়ে উনি গাড়ির বাম্পার চেপে ধরেন।

“তখন ব্যাক গিয়ার দিয়ে আবারও তাকে চাপা দেওয়া হয়। এরপর জোরে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিলে উনি উড়ে গিয়ে ফ্লাইওভারের গার্ডারে মাথায় ধাক্কা খান। সেখানে তার মগজ বের হয়ে যায়। তখন গাড়িটি টান দিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গাড়ির নম্বর প্লেট উদ্ধার করে।”

নিহত সেলিম ব্যাপারীর মেয়ে সাদিয়া আক্তার তামান্না সাংবাদিকদের বলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সর্বশেষ বাবার সঙ্গে তার কথা হয়।

“রাতে আমার বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়ার কথা ছিল। বাবা বলেছিলেন, ডিউটি শেষ করে গাড়ি জমা দিয়েছি। গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি, তোমার বাসায় যাব। এরপর মাকেও ফোন করে বলেছে, তোমরা ঘুমিয়ে পড়, আমি তামান্নার বাসায় যাব। এর কিছুক্ষণ পর রাত ১০টার দিকে আমার শ্বশুরের ফোনে কল করে কে যেন জানিয়েছে যে, বাবা অ্যাকসিডেন্ট করেছে, যেতে হবে।”

সেলিম ব্যাপারী একটি আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের গাড়ি চালাতেন বলে জানান তামান্না।

সেলিমের গ্রামের বাড়ি বরিশালে। সাত বছরের একটি ছেলে রয়েছে তার।

তামান্না বলেন, বাবার আয়েই তাদের সংসার চলত।

“ভাইটা ছোট। একটা মেয়ে হয়ে আমি আর কী করতে পারব? এখন কীভাবে চলবে?”