জাস্টিন ট্রুডোকে ভয় দেখাতে চান ট্রাম্প

: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। বাণিজ্য ও অর্থনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে উত্তেজনাকর বাদানুবাদ চলছে।

একপর্যায়ে ওভাল অফিস থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোকে ‘অ্যাসহোল’ (বেকুব) বলে গালি দিয়ে বসলেন।

আধুনিক মানব ইতিহাসে প্রতিবেশী দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের এক নেতা সম্পর্কে আরেক নেতা এভাবে মন্তব্য আগে কখনো করেননি। পিয়েরে ট্রুডো যখন এটি শুনলেন, তখন জবাবে তিনি বললেন, আমার সম্পর্কে নিকৃষ্টতম কথাটি যিনি বলেছেন, তিনি আমার চেয়ে অনেক ভালো লোক।

তারপর এতগুলো বছর কেটে গেছে। তবে অবস্থা সেই একই রকম রয়ে গেছে। পিয়েরে ট্রুডোর ছেলে ও কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সম্পর্কে ঠিক একই কায়দায় গত সপ্তাহান্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার তল্পিবাহকেরা অপমানকর কথা বলেছেন। ট্রাম্প কানাডার পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় আপত্তি তুলেছিলেন জাস্টিন ট্রুডো। এর জের ধরে তাকে ট্রাম্প ‘অসৎ ও দুর্বল’ লোক বলে উল্লেখ করেন। এরপরে ট্রুডো পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন পণ্যের ওপর জুলাই থেকে শুল্ক বসানোর ঘোষণা দেন। ট্রুডোর ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ফক্স নিউজে ট্রাম্পের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে খারাপ কূটনৈতিক আচরণ করেছেন এবং দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার পিঠে ছুরি মারতে চেয়েছেন—এ রকমের যেকোনো বিদেশি নেতার জন্য নরকে বিশেষ জায়গা বরাদ্দ করা আছে।

নাভারো তার বক্তব্যে জাস্টিন ট্রুডোর সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন। কানাডীয় স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ট্রাম্প শুল্ক আরোপ করায় ট্রুডো বলেন, এ বিষয়টি কানাডার নাগরিকেরা হালকাভাবে নেয়নি। এটিকে তারা অপমানজনক বিষয় হিসেবে মনে করছে। আফগানিস্তানের মাটিতে আমেরিকান সেনাদের সঙ্গে যে কানাডীয় সেনারা প্রাণ হারিয়েছে, তাদের স্বজনেরা ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে আহত হয়েছেন। সে কারণে ট্রুডো প্রতীকী পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বুর্বন (ভুট্টা থেকে প্রস্তুত একধরনের আমেরিকান হুইস্কি) ও শসাজাতীয় সবজির ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।

ট্রাম্পের তুলনায় ট্রুডোর এই প্রতিক্রিয়া খুবই মৃদু প্রকৃতির। আসলে আমেরিকার অযৌক্তিক দাবি মানতে রাজি না হওয়াই ট্রাম্পের ক্রোধের মূল কারণ। তিনি জি-৭ সম্মেলনের ইশতেহারে সম্মতি দেওয়ার পর আবার সেই সম্মতি থেকে সরে আসেন। নাভারোর মতে, ট্রাম্পের ওপর জাস্টিন ট্রুডোর আস্থাহীনতার কারণেই কানাডার সঙ্গে আমেরিকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক যে অবস্থাতেই যাক না কেন, ট্রুডো সম্পর্কে ট্রাম্প বাজে মন্তব্য করার পর কানাডীয়দের মধ্যে একধরনের জাতীয়তাবাদ লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা তাদের প্রধানমন্ত্রীর অপমান মেনে নিতে পারেনি এবং তার পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

ট্রাম্পকে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে বিভেদ সৃষ্টিকারী ব্যক্তি বলা যেতে পারে, কিন্তু তিনিই এখন কানাডীয়দের ঐক্য প্রতিষ্ঠার মহান উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। কানাডায় যারা জাস্টিন ট্রুডোর ঘোর শত্রু বলে পরিচিত, তারাও এখন তার প্রতি সহানুভূতির সুরে কথা বলছেন। সাবেক রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার পর্যন্ত ট্রুডোর পক্ষে কথা বলেছেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেছেন, ট্রাম্প কানাডার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কেন করছেন?

হারপারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি, এটি না বুঝতে পারার কোনো কারণ নেই। আসলে ট্রাম্প হচ্ছেন এমন একজন লোক, যিনি দুর্বলকে ভয় দেখিয়ে একধরনের ধর্ষকামিতার আনন্দ পান। ট্রুডোকে অপমানজনক কথা বলে তিনি সেই আনন্দ চরিতার্থ করতে চেয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, ট্রাম্প ভুলের মধ্যে আছেন। কানাডার জনসংখ্যা, ও অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় হয়তো ছোট, কিন্তু এর মানে এই নয় যে দেশটি ভয় পেয়ে যাওয়ার মতো দুর্বল।

ট্রাম্পের ক্রোধের মূল ফোকাসে পড়েছে কানাডার দুগ্ধশিল্প। এই শিল্পে কানাডা এমন একটি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ধরে রেখেছে, যা দুগ্ধজাত যেকোনো বিদেশি পণ্যকে কানাডার বাইরে রাখে। কানাডায় ঢুকতে দেয় না। কানাডীয়রা চায় এই ব্যবস্থাপনা জারি রাখার মাধ্যমে দুগ্ধশিল্পের এই স্বাবলম্বী অবস্থান অটুট থাকুক। কিন্তু ট্রাম্প চান, পুনরায় নাফটা সমঝোতা চালু করার অংশ হিসেবে কানাডা ওই ব্যবস্থাপনা বিলুপ্ত করুক।

কানাডীয়রা মনে করে, ট্রাম্পের অযৌক্তিক দাবি মেনে কানাডা তার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বাতিল করতে পারে না। একদিকে এটি জাতীয় সমৃদ্ধির পথে বাধা হবে, অন্যদিকে এটি জাতীয় মর্যাদারও বিষয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে কোনো মক্কেল রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায় না। এই মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার দাম দিতে গিয়ে যদি কয়েক বছর একটু কষ্ট করতেও হয়, তাতেও তারা রাজি আছে। এই জি-৭ সম্মেলনে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, সেটি হলো দীর্ঘ মেয়াদে কানাডা আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পারবে না। অর্থ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কানাডাকে নতুন মিত্রের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে।

একই সঙ্গে ইতিহাস থেকে ট্রাম্পের শিক্ষা নেওয়া উচিত। তার মনে রাখা উচিত, নিক্সন পিয়েরে ট্রুডোকে গালি দেওয়ার পর তিনিই কিন্তু কানাডার সবচেয়ে আইকনিক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশবাসীর অন্তরে টিকে আছেন। নিক্সনের পক্ষে ততটা সম্ভব হয়নি। আর ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করতে ভালোবাসে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান