পাহাড় ধ্বসের ঝুঁকিতে ১৭ হাজার মানুষ

ফুলকি অনলাইন: গত বছর ১৩ জুনের এই দিনটিতেই রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের শুরু। ভারী বৃষ্টিতে কয়েক দফায় পাহাড় ধসের ঘটনায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠতে হয় তিন হাজারেরও বেশি মানুষকে। তবে ভয়ঙ্কর সেই ঘটনা ভুলে আবারও একই একই স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে ঘরবাড়ি।  বার বার সতর্ক করার পরও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গড়ে তোলা হচ্ছে একের পর এক স্থাপনা।

প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, পুরো রাঙামাটিতে এখন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন।  শহরের ৩৩টি এলাকা এবং ১০ উপজেলায় মোট ৩৭টি এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।  তবে এরপরও এসব স্থানে বসতক নির্মাণ ঠেকানো যাচ্ছে না।

রাঙামাটি শহরের ভেদভেদী, যুব উন্নয়ন এলাকা, মনতলা আদাম, সাপছড়ি, পোস্ট অফিস এলাকা, মুসলিম পাড়া, নতুন পাড়া, শিমুলতলী, মোনঘর, সনাতন পাড়া এলাকায় গত বছর সবচেয়ে বেশি পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। কিন্তু এরপরও থেমে থাকেনি একই স্থানে বসত স্থাপন। পাহাড়ের পাদদেশে এখনও ঝুঁকিতে বসবাস করছে হাজারও পরিবার।

তবে পাহাড়কে ঝুঁকিমুক্ত করে বসবাসের উপযোগী করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এসব এলাকায় বসবাস করা সাধারণ মানুষ।  এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও কেউ বাড়িঘর ছাড়ছেন না।

মনতলা গ্রামের বাসিন্দা প্রকাশ চাকমা বলেন, ‘টানা বৃষ্টি হলেই সবাই ভয়ে থাকি। কিন্তু বাড়িঘর ছেড়ে কোথায় যাবো ভেবে পাচ্ছি না। সরকার আমাদের জন্য নিরাপদ জায়গা দিলে অবশ্যই যাবো।’

নতুন পাড়ার বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, ‘সরকার যদি সমপরিমাণ জায়গা দেয় তাহলে যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই যাবো।  না হলে মরলে এখানেই মরবো, আশ্রয়কেন্দ্রে যাবো না।’

এদিকে পাহাড় ধসের এক বছরেও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট এবং স্থাপনা পুরোপুরি মেরামত করা হয়নি। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের দুরত্ব ৭৪ কিলোমিটার।

গত জুনে এই সড়কের ৬০টি স্থানে পাহাড় ধসে সড়কের ওপর মাটির স্তূপ জমা হয়। এ কারণে আট দিন সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকে। এরপর হালকা যানচলাচলের ব্যবস্থা করা হলেও প্রায় দুই মাস লাগে সেখানে ভারী যান চলাচলের ব্যবস্থা করতে। এবার বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই জেলায় পাহাড় ধস হওয়ায় ফের সড়ক যোগাযোগ বন্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সংকটের সমাধান নেওয়া হয়নি কোনও।

পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নেতারা বলছেন, গত বছর পাহাড় ধসের পর যে কাজ হয়েছে তা সাময়িক। স্থায়ীভাবে কাজ না করলে এই বর্ষায় আবার যদি পাহাড় ধস হয় তাহলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

এ ব্যাপারে রাঙামাটি সড়ক বিভাগের দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন বলেন, ‘গত বছর পাহাড় ধসে সড়ক বিভাগের ৭টি সড়ক অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ৭টি সড়কের ১৪৫টি স্থানে পাহাড় ধস হয়, ৩টি স্থানে রাস্তা একাবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ১১৩ টি স্থানে সড়কের পাশের অংশ ভেঙে পড়ে। এ কারণে ভারী যান চলাচনের জন্য রাস্তাগুলো অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি সামলাতে অস্থায়ীভাবে যে কাজ করা হয় তাতে ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। সড়ক স্থায়ীভাবে রক্ষার কাজ আমরা শুরু করেছি। স্থায়ীভাবে রাস্তাগুলো টেকসই করার জন্য আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে কাজ শুরু করা যাবে। তখন আমাদের সব সড়ক ঝুঁকিমুক্ত করা যাবে।’

রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষজন সারানোর বিষয়ে প্রশাসন আমাদের কাছে সাহায্য চাইলে অবশ্যই সাহায্য করে থাকি। এবার টানা বর্ষণে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মানুষ যখন নিজ বাসা থেকে বের হচ্ছিল না, তখন প্রশাসনের লোকজনসহ আমরা তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করি। সাহায্য চাওয়া হলে আমরা যে কোনও সময় কাজর করতে প্রস্তুত আছি।’

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ বলেন, ‘গত বছর জুনে প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে চার সেনা সদস্যসহ মোট ১২০ জন নিহত হন।  হাজার হাজার মানুষকে তিন মাসের বেশি সময় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হয়। তাই এ বছর বর্ষা মৌসুমে আমরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছি।  ৯ জুন থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হলে আমরা ১০ জুন থেকে মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক করছি যাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরতরা নিরাপদ এলাকায় চলে যান।  এছাড়াও শহরে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের কাছে ৫০০ বান্ডেল ঢেউটিন, ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ লাখ টাকাসহ কিছু তাঁবু মজুদ রাখা হয়েছে।  কোথাও কিছু হলে জেলা প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, রেডক্রিসেন্ট, ফায়াস সার্ভিসসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী দল প্রস্তুত রয়েছে।