আমরা তো অ্যাটর্নি জেনারেলকে ডিক্টেট করতে পারি না: হাইকোর্ট

‘অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা, আমরা তো তাকে ডিক্টেট (নির্দেশ) করতে পারি না।’ বৃহস্পতিবার (৭ জুন) কুমিল্লায় নাশকতার ঘটনায় বিশেষ আইনে দায়ের করা মামলায় অ্যাটর্নি জেনারেলের সময়-আবেদনের বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে এমন মন্তব্য করেন বিচারপতি মো. শওকত হোসেন ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আদালতে খালেদা জিয়ার আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। সঙ্গে ছিলেন– ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার একেএম এহসানুর রহমান, অ্যাডভোকেট মো. মাসুদ রানা প্রমুখ। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন–  অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন প্রমুখ। এর আগে সকাল ১১টায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। মামলাটি শুনানির জন্য হাইকোর্টের কার্যতালিকায় ৩ নম্বর ক্রমিকে এলে খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন শুনানির জন্য আদালতে হাজির হতে না পারায় সময় চেয়ে আবেদন করেন আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী। এসময় আদালত অন্য মামলায় শুনানি শুরু করেন।

কিন্তু অন্য মামলার শুনানি চলাকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুববে আলম অন্য কোর্টে মামলা শুনানির জন্য যান। এর কিছু পরেই অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন শুনানির জন্য আদালতে উপস্থিত হলেও তখন অ্যাটর্নি জেনারেল এ কোর্টে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থিতির জন্য সময় আবেদন করেন। পরে আদালত শুনানির জন্য দুপুর ১২টা সময় নির্ধারণ করেন। এরপর ১২টার কিছু পরে মামলার শুনানি পুনরায় শুরু হয়। শুনানি শুরু করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন।

এসময় আদালত উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘অবকাশকালীন বেঞ্চে আমরা সব মিলিয়ে দুই ঘণ্টার মতো সময় পাই। সেখানে কিছু মামলা শুনি। এটা (খালেদা জিয়ার মামলা) তো বড় ম্যাটার, সময় লাগবে। এখন এই সময়টাও আপনারা নষ্ট করে দিবেন? আপনারা এটা (খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনটি) নিয়মিত বেঞ্চে শুনানি করেন।’

জবাবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘মামলাটা সাধারণই, শুধু নামটাই বড়।’

এ পর্যায়ে আদালত বলেন, ‘নাম বড় বলেই তো সমস্যা। অন্য কোনও মামলা কি মিডিয়ায় আসে এভাবে? একথা বলে খন্দকার মাহবুব হোসেনকে আবেদনের ওপর শুনানি শুরু করতে বলেন আদালত।’

এতে খন্দকার মাহবুব হোসেন খালেদা জিয়ার আবেদনের ওপর শুনানি করেন। তিনি বলেন, ‘এই মামলায় খালেদা জিয়ার নাম এজাহারে ছিল না। চার্জশিটে তার নাম এসেছে ১২১ নম্বরে। এই মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে। অন্য আসামিরা জামিনে আছেন। আমরা তার বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারিপূর্বক জামিন চেয়েছি। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সে আবেদন নামঞ্জুর করেছেন। এ বিষয়ে অন্য একটি বেঞ্চ (বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ) থেকে আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির একটি আদেশও (বিচারিক আদালতের প্রতি) দেওয়া হয়েছে।’

তখন আদালত বলেন, ‘হাইকোর্ট থেকে অন্য মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে দ্রুত জামিন শুনানি নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। এটা কি সেই একই ধরনের বিষয় (মামলার বিষয়বস্তু)?’

তখন খন্দকার মাহবুব হোসেন হ্যাঁ সূচক জবাব দেন।

আদালত বলেন, ‘জামিনের আবেদন নিষ্পত্তি না করার বিষয়ে অন্য একটি ডিভিশন বেঞ্চ থেকে একটা অর্ডার এসেছে। সিনিয়র বেঞ্চ থেকে যেহেতু একটা অর্ডার এসেছে, আমাদের তো সেটা অনুসরণ করা উচিত।’

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘তাহলে আপনারাও ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি ও জামিন আবেদন নিষ্পত্তির বিষয়ে আদেশ দিতে পারেন।’

এসময় আদালত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘যেহেতু ডিভিশন বেঞ্চ থেকে আবেদন নিষ্পত্তির বিষয়ে একটা অর্ডার এসেছে। ওয়েবসাইটেও দেওয়া হয়েছে, পত্রপত্রিকাতেও আমরা দেখেছি। তাহলে আমরা একই ধরনের আদেশ দিলে আপনার মতামত কী?’

তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘আমি আদেশটি (হাইকোর্টের) দেখি নাই। আগামী রবিবার পর্যন্ত সময় দিন, সেদিন দেখে এসে শুনানি করবো।’

তখন আদালত রবিবার পর্যন্ত মামলার শুনানি মুলতবি রাখেন। এবং বলেন, ‘মামলাটি সেদিন কার্যতালিকায় টপে (শীর্ষে) রাখা হবে।’

এসময় খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল সাহেব তো আদেশটা পড়ে এখনই একটা মতামত দিতে পারেন।’

এ পর্যায়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘চার পাতার রায় (মূলত সাত পৃষ্ঠা) পড়তে তিন দিন লাগে?’

তখন আদালত বলেন, ‘উনি তো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা। রবিবার পর্যন্ত সময় চেয়েছেন, অর্ডারটা দেখার জন্য। আমরা তো ‍উনাকে ডিক্টেট (বাধ্য) করতে পারি না। সিনিয়র হিসেবে তো আপনারাও এই প্রিভিলাইজটা এনজয় করেন। এই বলে আদালত শুনানি রবিবার পর্যন্ত মুলতবি করেন?’