ঈদযাত্রা: ঢাকা ছাড়ার চার পয়েন্টেই ভোগান্তির শঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার : প্রতি ঈদে ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো থেকে বের হতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় চলে যায়। এ বছর এই ভোগান্তি আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশি¬ষ্টরা বলছেন, ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে বের ও প্রবেশ হওয়ার চারটি স্থানই আগ থেকে সমস্যাসংকুল। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ঈদযাত্রার চাপ। এ অবস্থায় গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গুলিস্তান টার্মিনাল থেকে বাস বের হয়ে মহাসড়কে উঠতে এবং ঢাকায় প্রবেশের সময় ঝক্কিতে পড়তে হতে পারে। আর এর ফলে ঈদযাত্রার বিশাল একটা সময় চলে যেতে পারে ঢাকার ভেতরেই। তবে পুলিশ বলছে, রাস্তা যানজট মুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে।

সরেজমিন চারটি পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও অবৈধ দখল বা পার্কিং, রাস্তা খারাপ বা অপেক্ষাকৃত সরু এবং উন্নয়ন কাজের কারণে যানবাহনে ধীরগতি রয়েছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন ঢাকা ত্যাগ করে। স্থানগুলো সংকুচিত হওয়ায় যানবাহনের চাপ সামলাতে খুব হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে দূরপাল¬ার বাসগুলোর ঢাকায় প্রবেশে অনেক সময় লাগে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আট লেনের প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ীতে। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে কাঁচপুর ডাচবাংলা ব্যাংকের মোড় পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আট লেন হলেও দুই পাশের দুই লেন চলে গেছে পার্কিংয়ে। ডাচবাংলা ব্যাংকের মোড় থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত মহাসড়কটি আবার চার লেনের। কিন্তু কাঁচপুর সেতুতে গিয়ে গাড়ি ওঠে দুই লেনে। অর্থাৎ চার লেনের গাড়ি আবার এক লেনের সেতুতে উঠছে। সেতুর অপর লেনটি কুমিল¬া-চট্টগ্রামের দিক থেকে ঢাকায় আসা গাড়ির জন্য ব্যবহৃত হয়। ফলে অর্থনীতির লাইফ-লাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি আট লেনে উন্নীত হলেও সুফল আসেনি। কাঁচপুর ব্রিজ এবং মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতু দুই লেনের হওয়ায় প্রায়ই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আর এতে আটকা পড়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয় যাত্রীদের। কখনও কখনও যানজট তীব্র আকার ধারণ করে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার এলাকাও ছড়িয়ে যায়।  নোয়াখালীগামী হিমাচল পরিবহনের চালক রমজান উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের পুরো পথের মধ্যে ভোগান্তির পথ কাঁচপুর ব্রিজ। ব্রিজটি পার হলেই আমরা ধরে নিই গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। কারণ পুরো গন্তব্যে যে সময় লাগে ঈদ মৌসুমে তার সমান সময় চলে যায় কাঁচপুর ব্রিজে। আট লেন সড়কের যানবহনগুলো এই ব্রিজের এক লেন দিয়েই যাতায়াত করে।’ একই অবস্থা দেখা গেছে গাবতলী এলাকায়ও। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার গাড়ি দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। এ টার্মিনালের সামনের সড়কটিতে গত বছর মেয়র আনিসুল হক অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ করলেও এ বছর থেকে তা আবার আগের চেহারায় ফিরে এসেছে। টার্মিনালের সামনের রাস্তায় বাস থামিয়ে যেখানে সেখানে যাত্রী তোলা হয়। পর্বত সিনেমা হল থেকে কল্যাণপুর পর্যন্ত রাস্তার অর্ধেক অংশজুড়ে যাত্রীবাহী বাস পার্কিং করে রাখা হয়। আর আমিনবাজার ব্রিজের পর তুরাগ নদী পর্যন্ত দুই পাশের রাস্তায় ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এই কারণে দূরপাল¬ার বাস ঢাকা ছাড়তেই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে যায়। সংশি¬ষ্টরা জানিয়েছেন, গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন উত্তরবঙ্গসহ ২৬টি জেলায় কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে। রাজধানীর সঙ্গে সড়ক পথে উত্তরবঙ্গ যাতায়াতের একমাত্র রুট ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক। প্রতিবছর ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের যানবাহনের ভিড়ে এই মহাসড়কে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন চালক ও যাত্রীরা। এবারের ঈদযাত্রায়ও এই মহাসড়কে তীব্র যানজটের আশঙ্কা করছেন যাত্রী সাধারণ ও চালকেরা। এছাড়াও গাবতলী, মাজাররোড, আশুলিয়া, ইপিজেড, চন্দ্রা, হেমায়েতপুর চৌরাস্তা, বলিয়াপুর, আমিনবাজার, নবীনগর ২০ মাইল এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র যানজট লেগে থাকে। যার রেশ চলে আছে মহাখালি বাস টার্মিনাল পর্যন্ত। জানতে চাইলে ডিপজল পরিবহনের একজন কাউন্টার ম্যানেজার বলেন, ‘উরাঞ্চলগামী যেসব পরিবহন রয়েছে সেগুলোর পার্কিং করার মতো টার্মিনালে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সে কারণে রাতে বাস ও ট্রাকগুলো সড়কেই পার্কিং করে। ঈদের সময় বাসের সংখ্যা কিছু বাড়ে। ফলে যানজটও বাড়ে। যদি সড়কটি পার্কিং মুক্ত রাখা যায় তাহলে যানজট থাকবে না।’ অপরদিকে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকা ময়মনসিং মহাসড়কের আব্দুল¬াপুর পয়েন্টেই লেগে যায় প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময়। টঙ্গী স্টেশন রোড, গাজীপুর চৌরাস্তা, শহীদ আহসান উল¬াহ মাস্টার উড়াল সেতু, মীরের বাজার, উলুখোলা, কাঞ্চনব্রিজ, ভুলতা, মধাবদী, ভৈরব, দুর্জয়মোড়, পাঁচদোনার বিভিন্ন স্থানে যানজট লেগে থাকে।

এছাড়া গুলিস্তান থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী যানবাহনের চাপে বাবুবাজার ব্রিজ পার হতেই সময় লেগে যায় কয়েক ঘণ্টা। এই সড়কটির দুটি লেনের মধ্যে একটি লেন অবৈধ পার্কিং ও আশপাশের দোকানিদের রাখা বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর কারণে অচল থাকে। বাকি একটি লেন দিয়েই অত্যন্ত ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করে। এই সড়কটি দিয়ে সড়ক পথের যাত্রীদের পাশাপাশি ফেরি ঘাটের সব যাত্রীই চলাচল করেন। ঈদযাত্রায় এই যানজট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘প্রতি ঈদে ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এই কারণে দূরপাল¬ার বাস ঢাকা ছাড়তেই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। যাত্রাবাড়ীতে প্রবেশপথ কাঁচপুর মহাসড়ক আট লেনে উন্নীত করা হলেও সুফল মেলেনি। দুই পাশের দুই লেন চলে গেছে পার্কিংয়ে। আর দুই লেনে গাড়ি চলে উল্টো পথে। গাবতলী এলাকায় অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ করা হলেও তা আবার ফিরে এসেছে। টার্মিনালের সামনের রাস্তায় বাস থামিয়ে যত্রতত্র যাত্রী তোলা হচ্ছে। মহাখালির অবস্থাও খারাপ। এই টার্মিলের রুট গুলোতে পথে পথে যানজট ভোগান্তি।’  তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি এবছরও যানজট থেকে ঈদে ঘরমুখো মানুষ মুক্তি পাচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন স্থানের সড়ক-মহাসড়কের পাশাপাশি ঢাকা থেকে প্রবেশের চারটি পয়েন্টের মধ্যে তিনটিরই অবস্থা খারাপ। এই সমস্যাগুলো অনেক আগ থেকে চিহ্নিত। সরকারকে অনেক আগ থেকেই তা সমাধান করা উচিত ছিল।’ কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় যানজটের আশঙ্কার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপদ অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী আলীউল হোসেন বলেন, ‘আমাদের কাঁচপুর দ্বিতীয় ব্রিজের নির্মাণকাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই নির্মাণকাজ শেষ হবে। এরপর আর ওই এলাকায় যানবাহনের জট থাকবে না।’ ঢাকা ছাড়ার চার পয়েন্টে ভোগান্তির শঙ্কা নিয়ে মতামত জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে মানুষের যাতে ভোগান্তি না হয় সেজন্য আমাদের আগাম প্রস্তুতি রয়েছে। রমজান ও ঈদ উপলক্ষে আমরা পুলিশসহ বিভিন্ন পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতি ও লঞ্চঘাট সমিতিসহ সবার সঙ্গে মিটিং করেছি। বিশেষ করে টার্মিনালের ব্যাপারে বলতে চাই। আজও (বুধবার) আমরা সায়েদাবাদে মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে মিটিং করেছি। সেখানে অনুরোধ করেছি যে মূল সড়কে বেশি গাড়ি রেখে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা না হয়। সড়কে যেটা থাকবে সেটা দ্রুত চলে যাবে। হকার যাতে কম আসে সে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

মফিজ উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘আমরা পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা সেখানে রাখবো। তারপর কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা থাকবে। ঢাকায় প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পথে বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে যাতে দ্রুত ট্রাফিক সিগন্যাল ক্লিয়ার করে দেওয়া যায়। একইসঙ্গে পাশ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার সঙ্গেও আমাদের সমন্বয় থাকবে। প্রতিটি টার্মিনালে আমাদের ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থাকবে। সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে মনিটরিং করা হবে। বিভিন্ন ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। ঈদের সময় যখন ভিড় হবে ঠিক সেই সময় আমাদের স্পেশাল ডেপ¬য়মেন্ট থাকবে। আমরা কোনও কমিনিউকেশন গ্যাপ রাখতে চাই না। সবার সঙ্গে সমন্বয় করে ও যোগাযোগ রেখে কাজ করছি। গাড়ির চাপ হবে, যাত্রীর চাপ হবে এটা ঠিক আছে। এর মধ্যে যদি বৃষ্টি হয় তাহলে আরেকটু ভোগান্তি থাকতে পারে। সবকিছু মাথায় রেখে আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করি ঈদের সময় সুন্দরভাবে মানুষ তাদের গন্তব্যে যেতে পারবে।’