আশুলিয়ায় ঈদকে ঘিরে পরিবহন থেকে বেপড়োয়া চাঁদাবাজি

সেলিম আহমেদ : আশুলিয়ায় ঈদকে সামনে রেখে ছোট-বড় গণপরিবহনে চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিন এসব পরিবহন থেকে সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে শুরু করে মাসিক এক হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর ঈদ এলেই যেন চাঁদাবাজির মাত্রা বেড়ে যায় আরও কয়েক গুণ। তবে চাঁদাবাজির নেপথ্যে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পুলিশের সংশ্লিষ্টতা থাকায় প্রতিনিয়ত তারা নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাদের।

গত ২৬ মে বাইপাইল এলাকায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়ক পরিদর্শনে এসে চাঁদাবাজি বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু তারপরও পুলিশ রহস্যজনক কারণে এসব চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কোন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে, আশুলিয়ার নবীনগর, নয়ারহাট ও ধামরাইয়ের ইসলামপুর, কালামপুর, শ্রীরামপুরসহ বেশ কিছু জায়গায় বিভিন্ন পরিবহনে চাঁদাবাজিতে মত্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ। এছাড়া নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের নবীনগর ও বাইপাইল এলাকায় এই চাঁদাবাজির মাত্রা আরো অধিক। আর প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে এখানে চাঁদাবাজি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। শুধুমাত্র বাইপাইল ত্রিমোড়ে মাহিন্দ্রা পরিবহন থেকে মাসে প্রায় ৩০ লাখ, আশুলিয়া ক্ল্যাসিক থেকে সাড়ে ১১ লাখ, অন্যান্য পরিবহন থেকে প্রায় ১ লাখ ও নয়ারহাট এলাকায় বিভিন্ন গণপরিবহন থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা চাঁদা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার একাধিক মাহেন্দ্রা চালক অভিযোগ করে বলেন, টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের আশুলিয়া বাজার থেকে বাইপাইল পর্যন্ত প্রায় ৪ শতাধিক অবৈধ থ্রি হুইলার মাহিন্দ্রা পরিবহন চলে। যে গুলোর কোন কাগজ নেই। আর সে জন্য এসব পরিবহন থেকে প্রতিদিন প্রত্যেকটি পরিবহণ থেকে ১৩০ টাকা করে চাঁদা আদায় করেন আপেল নামে একজন।

এছাড়া বাইপাইল জাকির নামে একজন আলাদা ভাবে ২৫০০ টাকা করে মাসোহারা আদায় করে। এমনকি নতুন কেউ এই সড়কে মাহিন্দ্রা চালাতে চাইলে চাঁদাবাজ জাকিরের নিকট ৫-১০ হাজার টাকা ফি দিয়ে ভর্তি হতে হয়। আর কোন চালক যদি মাসোহারা দিতে না পারে কিংবা দিতে না চায় তাহলে জাকির সার্জেন্টের মাধ্যমে ঐ চালকের পরিবহনটি আটকে দিয়ে ১০-৩০ হাজার টাকা জোরপূর্বক আদায় করে। মাঝে মধ্যে মাসোহারার জন্য চালকদের মারধর করে জাকির। কিন্তু চাঁদাবাজ জাকির স্থানীয় নেতা ও ট্রাফিক পুলিশের ছত্রছায়ায় থাকায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস পায় না কেউই।

চালকদের অভিযোগ, চাঁদাবাজ জাকিরসহ অন্যান্যদের অত্যাচারে এখন তাদের পরিবহন চালানো দূরুহ হয়ে পড়েছে। চাঁদার টাকা দিতে না পেরে তাদের মধ্যে অনেক চালক জাকিরের হাতে হেনস্তা হয়ে নিজেদের পরিবহন বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

এছাড়া খেয়া পরিবহনের এক চালক অভিযোগ করেন, বাইপাইল এলাকায় সব গণপরিবহন থেকে চাঁদা উত্তোলন করা হয়। সব চেয়ে চাঁদার পরিমাণ বেশি গুণতে হয় নবীনগর থেকে মহাখালী রুটের আশুলিয়া ক্ল্যাসিক পরিবহনের বাসগুলোকে। প্রতিদিন সড়কের বিভিন্ন স্থানে তাদের ৭০টি বাসের জন্য পৃথকভাবে ১,৫৬০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এর মধ্যে এয়ারপোর্ট এলাকায় ২শ, বিশ্বরোড এলাকায় ৩শ, মহাখালী টার্মিনালে সাড়ে ৩শ, নবীনগরে ১৬০ ও বাইপাইলে সাড়ে ৫শ টাকা। এছাড়া ইপিজেড থেকে মিরপুরগামী আলিফ, মোহনা ও আব্দুল্লাহপুর থেকে নবীনগরগামী হিউম্যান হলারগুলোকে ৩০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা গুণতে হয়।

অভিযোগের সত্যতা জানতে চাঁদা উত্তোলনকারী জাকিরের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর, বাইপাইল, পল্লীবিদ্যুৎ ও বলিভদ্র এলাকায় রেন্ট-এ কারের চালকদের নিকট থেকে জয় নামে এক ব্যক্তি আশুলিয়া থানার হয়ে চাঁদা আদায় করে বলে অভিযোগ চালকদের। প্রতি মাসে ৫০০ থেকে ৭০০ করে টাকা দিতে হয় প্রাইভেটকার চালকদের।

অপরদিকে একই মহাসড়কের আশুলিয়া থানাধীন নয়ারহাট এলাকায় দিনের যে কোন সময় গেলেই চোখে পড়বে গণপরিবহন থেকে চাঁদা সংগ্রহের খোলামেলা দৃশ্য।

লেগুনা, ট্রাক ও গণপরিবহনের একাধিক চালক অভিযোগ করে বলেন, নয়ারহাট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনেই ডি-লিংক, স্বজন, ভিলেজ লাইন, পদ্মা লাইন, মানিকগঞ্জ পরিবহন ও লেগুনাসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক বিভিন্ন পরিবহন থেকে দৈনিক গড়ে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা উত্তোলন করা হয়। শাহজাহান নামে এক ব্যক্তি ও তার সহযোগী প্রতিদিন এই চাঁদা আদায় করেন।

এদিকে শাহাজাহানকে হাতেনাতে চাঁদা উত্তোলনের সময় পাওয়া গেলেও সে কোন চাঁদাবাজির সাথে জড়িত নয় বলে জানায়।

নয়ারহাট ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনেই প্রকাশ্যে কিভাবে চাঁদাবাজি হচ্ছে এব্যাপারে সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবেদ হোসেন বলেন, পরিবহনে চাঁদাবাজির বিষয়টি ক্রিমিনাল কেইস। আপনারা এব্যাপারে থানায় যোগাযোগ করুন।

চাঁদাবাজির অভিযোগের ব্যাপারে ঢাকা জেলা ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম জানান, বাইপাইল এলাকায় মাহিন্দ্রা পরিবহনে চাঁদাবাজির ঘটনায় ট্রাফিক পুলিশের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তার জানা নেই। তবে ট্রাফিক পুলিশের কোন কর্মকর্তা বা সদস্য এর সাথে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, গত ১১মার্চ (রবিবার) দুপুরে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের জামগড়া এলাকায় অটো রিকশা চালক আব্দুল মালেকের (৩২) কাছে চাঁদা চেয়ে না পেয়ে নুরুল আমিন নামে এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য তাকে বেধড়ক মারধর করে। এসময় তার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গা অন্ডকোষে আঘাত লেগে মালেক অচেতন হয়ে পড়লে পুলিশ ও পথচারীরা তাকে নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালে ভর্তি করে। ওই ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও রিকশা শ্রমিকরা প্রায় ঘন্টাব্যাপি টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেয় তারা। এরআগে গত বছরের ৩০জুন (শুক্রবার) সকাল সাড়ে ১০টায় বাইপাইল ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে অটোরিকশা চালক শামীম শিকদারের অটোরিকশার ব্যাটারি খুলে নেয়। পরে ফেরত দেয়ার জন্য ৪ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে ট্রাফিক পুলিশ। এর প্রতিবাদে পাশের দোকান থেকে কেরোসিন কিনে গায়ে আগুন দেয় শামীম। পরদিন দগ্ধ অটোরিকশাচালক শামীম সিকদারের শরীরে আগুন দিতে প্ররোচনাকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্য মনির ও ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছে রিকশা শ্রমিক ও মালিকরা।

এ ধরনের আলোচিত একাধিক ঘটনা থাকলেও আজও বন্ধ হয়নি চাঁদাবাজী। আর চাঁদাবাজরাও রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে।