শিক্ষকদের এমপিও নিয়ে ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’র অভিযোগ বাড়ছেই

বেসরকারি স্কুল ও কলেজ শিক্ষকদের এমপিও (মান্থলি পে-অর্ডার) নিয়ে আঞ্চলিক অফিসগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দিন দিন জোরালো হচ্ছে। প্রাপ্যতার শর্ত পূরণ না করলেও এমপিও দেওয়ার সুপারিশ এবং প্রাপ্যতা থাকলেও ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখা হচ্ছে অদৃশ্য কারণে। এই অভিযোগের পর কয়েক দফা চিঠি জারি করেছে মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। রংপুর অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালককে বদলির সুপারিশও করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি সূত্রে জানা গেছে, রংপুরের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক উপ-পরিচালক মো. মোস্তাক হাবিব দুই দফা শিক্ষকদের বঞ্চিত করেছেন। তার উদাসীনতার কারণে মার্চ মাসে দুই হাজারের বেশি শিক্ষক এমপিও পাননি। বঞ্চিত শিক্ষকদের পক্ষে (১৯ মার্চ) গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট স্মৃতিসৌধ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক মতলুবুর রহমান পলাশ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব এবং মাউশির মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

এই অভিযোগের পর উপ-পরিচালককে মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদালয়ে বদলির জন্য গত ২৮ মার্চ মাউশির মহাপরিচালক শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন। এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে অভিযোগকারী শিক্ষকের মে মাসের এমপিও থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে।

উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিপণন বিষয়ে নিয়োগকৃত রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক ফয়সাল আহমেদ রনি, আরিফুল ইসলাম প্রমুখ অভিযোগ করে বলেন, ‘উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন বিষয়ের প্রায় ৪০ শিক্ষকের ফাইল উপ-পরিচালক নিষ্পত্তি করছেন না দীর্ঘদিন থেকে। আগামী ১০ জুন আবার আবেদনের সময় শুরু হচ্ছে। ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি না করলে আগস্ট মাসের এমপিও পাবেন না এখানকার শিক্ষকরা।’

মাউশি সূত্রে জানা গেছে, গত মে মাসের এমপিও নিয়ে দুর্নীতি ও উদাসীনতার অভিযোগ উঠলে গত ২৮ মে মাউশিতে অনুষ্ঠিত এমপিও সংক্রান্ত বৈঠকে রংপুর ও ঢাকাসহ তিনটি অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালককে ভর্ৎসনা করা হয়।

মাউশির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদাসীনতার কারণে মে মাসের এমপিও বঞ্চিত হন রংপুরের এক হাজার ১৫০, ঢাকার ৫৭১ জন ও ময়মনসিংহের ২৭৩ জন শিক্ষক। গত মার্চ মাসেও এসব শিক্ষকরা বঞ্চিত হয়েছিলেন।

জানা গেছে, প্রাপ্যতার শর্তপূরণ না করে এমপিও দিতে সুপারিশ করার পর শর্ত পূরণের জন্য দুই দফা চিঠি জারি করে মাউশি। গত ২৫ এপ্রিল মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত  সব অঞ্চলের আঞ্চলিক উপ-পরিচালকদের উদ্দেশে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, অনলাইনে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) এমপিও সংক্রান্ত প্রস্তাব সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে অনুমোদন চেয়ে অধিদফতরে পাঠানো যাবে না। কাগজপত্রে সংযুক্তির ঘাটতি থাকলে, জনবল কাঠামো অনুযায়ী পদের প্রাপ্যতা না থাকলে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে ফাইল ফেরত দিতে হবে।

কিন্তু এই নির্দেশনা না মেনে দীর্ঘদিন ফাইল আটকে রাখা হয় আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের অফিসে। ফাইল নিষ্পত্তিও করা হয় না, আবার ফেরতও দেওয়া হয় না অদৃশ্য কারণে। শিক্ষকরা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ঝুলে থাকেন মাসের পর মাস।

আবার, অনেকক্ষেত্রে আঞ্চলিক উপ-পরিচালক অফিস থেকে মন্তব্য ছাড়াই ফাইল পাঠানো হয়। প্রাপ্যতা না থাকলে সুবিধা নিয়ে ফাইল পাঠানো হয় মাউশিতে। যদিও এসব ফাইল সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ জেলা শিক্ষা অফিসে ফেরত নির্দেশনা রয়েছে।

গত ১৯ এপ্রিল মাউশির জারি করা চিঠিতে বলা হয়, মন্তব্যবিহীন আবেদন পাঠানো যাবে না, সুনির্দিষ্ট মতামত দিতে হবে, কারণ উল্লেখ করে ফাইল ফেরত পাঠাতে হবে।

কুড়িগ্রাম জেলার মিজানুর রহমান নামের একজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, ‘সব ডকুমেন্ট নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস অনলাইনে ফাইল পাঠায় জেলা অফিসে। জেলা অফিস ওই ফাইল ফরোয়ার্ড করে উপ-পরিচালকের অফিসে কিন্তু আমার ফাইলে কোনও ডক্যুমেন্ট এটাচ (সংযুক্ত) নেই। আর এ কারণে মে মাসে আমার এমপিও হয়নি।’

অভিযোগ ও মাউশির পদক্ষেপ নিয়ে মাধ্যমিক  উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কোনও শিক্ষককের প্রতি অন্যয় করা হলে আমরা তা দেখবো। কোনও শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হোক আমরা তা চাই না।