রাজনীতির মাঠ সেপ্টেম্বরের দিকে উত্তাল হতে পারে

 ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ মূলত একতরফাই বলা চলে। যদিও জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। শুরুর দিকে সব কিছু সামলাতে এ একতফতা সরকার হিমশিম খেলেও গত তিন বছর যাবৎ পরিস্থিতি শান্ত। কিন্তু নির্বাচনমুখী রাজনীতির একতরফা মাঠ উত্তাল হয়ে উঠতে পারে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে। অক্টোবরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন। সরকারও জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ছোট্ট পরিসরে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠনের বিষয়টি ভাবছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি এ রকম সহজ সমীকরণের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নয় বলেই জানা গেছে। দলটি নির্বাচনের আগে অন্তত তিনটি দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা করছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার আগেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি পূরণ না হওয়ায় তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে নামে। নির্বাচনের দিন সারা দেশে ছিল থমথমে পরিবেশ। সংঘর্ষ ও হানাহানির মধ্য দিয়ে শেষ হয় একতরফা নির্বাচন। ফলে দেশ-বিদেশে বিতর্কিত একটি নির্বাচন হিসেবেই ৫ জানুয়ারি পরিচিতি লাভ করে।

ফের জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। এবার কী হবে এ রকম প্রশ্ন জনমনে- রাজনীতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ পরিস্থিতি মোটেই পাল্টায়নি; বরং আরো জটিল হয়েছে। সরকারি দলের চিন্তা অনুযায়ী আগামী অক্টোবরে গঠিত হবে ‘সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়েই গঠিত হবে ছোট আকারের এই মন্ত্রিসভা। বর্তমান সংসদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় নির্বাচনকালীন সরকারেও তাদের প্রতিনিধি রাখার পক্ষে নয় শাসক দল। সরকারের নিয়মিত কাজ পরিচালনার পাশাপাশি একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে এ নির্বাচনকালীন সরকার।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, অক্টোবরের শুরুতে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা স্পষ্ট হবে। বর্তমান সরকারের যেসব মন্ত্রী একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না, তাদের বেশির ভাগই এ নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকবেন এটা প্রায় নিন্ডিত। এ ছাড়া বর্তমান মন্ত্রিসভায় যারা রয়েছেন তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে সরিয়ে মন্ত্রিসভা কাটছাঁট করে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সরকারে নতুন কোনো মন্ত্রীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপিসহ যেসব দল দশম সংসদে নেই, তারা নির্বাচনকালীন সরকারে থাকবে না। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি (জেপি) ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের প্রতিনিধিত্ব থাকবে মন্ত্রিসভায়। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিকে আর ডাকার সুযোগ আছে বলে মনে করেন না সরকারি দলের নেতারা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আন্দোলন চলাকালীন বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে অবশ্য ফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। তবে এবার নির্বাচনী দাবির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যু। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তার মুক্তির জন্য আইনি চেষ্টা চলছে। যে মামলায় কারাভোগ করছেন, সেটিতে তিনি ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছেন। কিন্তু আরো বেশ কয়েকটি মামলার কারণে তার মুক্তি আটকে গেছে। এসব মামলার একটিতে জামিন হলে, অন্যটিতে জামিন মিলছে না। আবার জামিন স্থগিতও হয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে বলেছেন, সরকার সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে খালেদা জিয়ার জামিন আটকানোর চেষ্টা করছে। তিনি যেন বেরোতে না পারেন, তা তারা নিন্ডিত করতে চাচ্ছে। সরকারের মূল লক্ষ্য রাজনীতি থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রাখা ও যে নির্বাচন ডিসেম্বরে আসছে সেই পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটকে রাখা।

এমন অবস্থায় চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে রাজপথের আন্দোলনেই সমাধান দেখছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকেরা এ জন্য একটি কার্যকর সময়ের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার আগে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই সেই আন্দোলনের সূচনা হতে পারে এমন আভাস দিয়েছেন দলের সিনিয়র নেতারা।

নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া ও নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে তিনটি দাবির যৌক্তিক সমাধান চায় বিএনপি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে তাদের আন্দোলন বহু দিন ধরেই চলে আসছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দী হওয়ার পর সেই আন্দোলনের সাথে তার মুক্তি আন্দোলন যোগ হয়েছে। দলীয় প্রধানের মুক্তি তাদের প্রধান এজেন্ডা। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না, হতে পারে না। সরকার যতই নীলনকশা প্রণয়ন করুক না কেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি আর হবে না। ড. মোশাররফ জানান, নেত্রীর মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ও সংসদ ভেঙে নির্বাচনের দাবিতে তাদের আন্দোলন চলবে।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দল পরিচলায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি নিন্ডিত করতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আগামীতে রাজনৈতিক কর্মসূচির ছক কেমন হবে, তা নিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিনিয়র নেতাদের সাথে শলাপরামর্শ করছেন। তিনি একটি কঠোর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে নিয়ে যেতে চান বলে জানা গেছে। দলটির সিনিয়র নেতারা বলেছেন, নির্বাচনকালীন কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নে সমঝোতা করেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে। তবে সেটা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই হতে পারে।