ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে মামলাগুলোর সুরাহা কবে?

স্টাফ রিপোর্টার : ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) হলো একটি সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতি। এই আদালতে বিচারক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তার বিচারিক এখতিয়ার অনুযায়ী উপস্থিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে দোষীকে দণ্ড দিয়ে থাকেন। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের যেমন বিশাল অর্জন রয়েছে, তেমনই  এই আদালতে অনেকে হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের বৈধতার প্রশ্নে হাইকোর্ট পর্যন্ত মামলা গড়িয়েছে। হাইকোর্টে এসব মামলা এখনও শুনানির অপেক্ষাতেই আছে।

২০০৭ সালে ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশটি’ জারি করে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর জাতীয় সংসদে এটিকে আইনে পরিণত করে, যা কিনা ‘মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯’ নামে পরিচিত।

এই আইন অনুসারে ২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ভবন নির্মাণ আইনের কয়েকটি ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে আবাসন কোম্পানি এসথেটিক প্রোপার্টিজ ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান খানকে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরপর একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর ২০১১ সালের ১১ অক্টোবর ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের কয়েকটি ধারা ও উপ-ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট আবেদন করেন তিনি। রিটের শুনানি নিয়ে একই বছর রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

আদালতের জারি করা রুলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ৫ নম্বর ধারাসহ এবং ৬(১), ৬(২), ৬(৪), ৭, ৮(১), ৯, ১০, ১১, ১৩, ১৫ ধারা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আইনটির ৫ নম্বর ধারায় সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা প্রদান, ৬ নম্বর ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা, ৭ নম্বর ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পদ্ধতি, ৮ (১) ধারায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দণ্ড আরোপের সীমাবদ্ধতা, ৯ নম্বর ধারায় অর্থদণ্ড আদায় সম্পর্কিত বিধান, ১০ নম্বর ধারায় একই অপরাধে পুনরায় বিচার ও শাস্তি, ১১ নম্বর ধারায় ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রয়োগ, ১৩ নম্বর ধারায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির আপিলের প্রসঙ্গে এবং ১৫ নম্বর ধারায় আইনসংশ্লিষ্ট তফসিল সংশোধনের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে।

পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বৈধতা প্রশ্নে আরও দু’টি রিট করা হয়। এরপর তিনটি রিটের মোট ১৯ জন আবেদনকারীর শুনানি শেষে ২০১৭ সালে ১১ মে রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

ওই রায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা সংক্রান্ত ২০০৯ সালের আইনটির ১১টি ধারা ও উপ-ধারাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এই আইনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাও অবৈধ ঘোষণা করা হয়।  হাইকোর্টের রায় প্রসঙ্গে রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম বলেন, ‘হাইকোর্ট তার রায়ে বলেছিলেন, ‘এ আইনটি অসাংবিধানিক ও মাসদার হোসেন মামলার (নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ) রায়ের পরিপন্থী। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী।’ কিন্তু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে হাইকোর্টের রায়টি স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আইন মন্ত্রণালয় দুটি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটিসহ মোট তিনটি লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করা হয়। দীর্ঘ শুনানি নিয়ে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা গত ১৬ জানুয়ারি আবেদন তিনটি মঞ্জুর করেন এবং তাদেরকে নিয়মিত আপিল দায়েরের আদেশ দেন। একইসঙ্গে এসব আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত রাখেন। এরপর থেকে মামলাটি কার্যতালিকায় না আসায় এর ওপর কোনও পক্ষেরই আর শুনানি করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ সময়ের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় হাইকোর্টের রায় কোনও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।

জানতে চাইলে রিটকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম বলেন, ‘মামলাটি বেশ জনগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা কম। আবার গুরুত্বপূর্ণ নতুন মামলার চাপও বাড়ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত সংক্রান্ত মামলাটি দীর্ঘ শুনানির ব্যাপার, সময়ের ব্যাপার। আশা করছি, ঈদের পরে আদালতের সংখ্যা ও বিচারপতিদের সংখ্যা বাড়ানো হবে। তখন আমরা বিষয়টি শুনানির জন্য আদালতে আরজি জানাবো।’ এছাড়া, এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, ‘মামলাটি (রাষ্ট্রপক্ষের আপিল) শুনানির অপেক্ষাতেই আছে। লিস্টে (আপিল বিভাগের কার্যতালিকায়) আসলেই শুনানি করতে পারবো।’