প্রসবকালীন হৃদরোগে বেশি আক্রান্ত হন বাংলাদেশি মায়েরা

ফুলকি ডেস্ক : প্রথম সন্তানের জন্ম নিতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন শায়লা। এতে তার সন্তানের মৃত্যু হয়, মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েন তিনি নিজে। এরপর শায়লা-রুমেল দম্পতি সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিছুদিন পর আবার আগ্রহী হলে তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এবার চিকিৎসকের পরামর্শে নিরাপদেই তাদের সন্তানের জন্ম হয়। কানাডায় উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়েছিলেন শাহানা আফরোজ (ছদ্মনাম)। সেখানেই তিনি গর্ভধারণ করেন। প্রসবের সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হন। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে একেবারেই মা হতে বারণ করে দেন। দেশে ফিরে তিনি চিকিৎসকের কাছে যান এবং বলেন, মরি আর বাঁচি আমার সন্তান লাগবেই। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি দ্বিতীয়বার গর্ভধারণ করেন। সেসময় তিনি আবারও হৃদরোগে আক্রান্ত হন। অন্তঃসত্ত্বা মায়ের জন্য অন্যতম একটি ঝুঁকি হিসেবে কাজ করে প্রসবকালীন হৃদরোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশের মায়েরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। ইউরোপের মায়েরা এই রোগে আক্রান্ত হলে তারা দ্বিতীয় সন্তান ধারণের অনুমতি পান না। কিন্তু বাংলাদেশে মায়েরা এই রোগ নিয়েই দ্বিতীয়বার গর্ভধারণ করছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, আবহাওয়া ও বাংলাদেশি নারীদের সক্ষমতাই এর বড় কারণ। এই রোগের হার বেশি হলেও মৃত্যুঝুঁকি এখনও কম।

চিকিৎসকরা বলছেন, যখন সন্তান গর্ভে থাকে তখন মায়ের লিভার থেকে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়। এগুলো ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে ক্ষতি হয় মা ও শিশুর। আর তখনই মায়ের জটিলতা তৈরি হয়। গর্ভকালীন অবস্থায় শেষের দিকে ৫ মাস থেকে শুরু করে প্রসবের পর ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত যেকোনও নারীরই এই রোগ হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোতে হৃদরোগে নারীদের আক্রান্তের হার অনেক বেশি। বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্তের হার বেশি হলেও মৃত্যুর হার খুব কম। এই রোগের কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে, যে মায়েদের মধ্যে স্থূলতা, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগের অতীত অভিজ্ঞতা, অপুষ্টি, ধূমপান, মদ্যপান, ত্রিশোর্ধ্ব গর্ভধারণ এবং নির্ধারিত সময়ের আগে (৭ মাস) সন্তানের জন্ম হওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। দ্রুত হৃদস্পন্দন, বুক ব্যথা, অত্যাধিক ক্লান্তি, শারীরিক কার্যকলাপের সময় ক্লান্তি, নিশ্বাসের দুর্বলতা, পায়ের গোড়ালি ফুলে যাওয়া এবং রাতে প্রস্রাব বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যে দিয়ে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। নিয়মিত ব্যায়াম, কম চর্বিযুক্ত খাবার, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহারের মাধ্যমে মায়েরা এই রোগ থেকে দূরে থাকতে পারে। যুক্তরাজ্যের বার্ষিক সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারীর দুজন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশে এই রোগ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই বলে জানান সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।  বিএসএমএমইউ এর হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক বলেন, ‘আমি এই ধরনের যত রোগী পেয়েছি, তারা প্রত্যেকেই সুস্থ আছেন। আর এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের মায়েদের শারীরিক সক্ষমতার কারণেই। এই রোগ যেহেতু নির্দিষ্ট কারণ এখনও নির্ণয় করা যায়নি তাই এটি প্রতিকারের বিষয়টি বলা মুশকিল। তবে গর্ভাবস্থায় মায়ের লিভার থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের হয়, যা মেডিসিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়।’ জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. আফরোজা খানম রুমু বলেন, ‘অন্তঃসত্ত্বা মায়ের জন্য এটা খুবই ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন হয়। কেননা প্রসবের সময় নারীর হার্টের পাম্প এমনিতেই অনেক বেড়ে যায়। যেসব নারীর হার্টের অবস্থা বেশি খারাপ থাকে তাদের আমরা সন্তান ধারণ করতেই না করি। এরপর যদি তার শারীরিক অবস্থা ভালো হয় তখন তিনি মা হতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে প্রসবের সময় মায়ের জন্য বাড়তি সতর্কতা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। কেননা, প্রসবের সময় এবং প্রসবের পরেই মায়ের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই আমরা পরামর্শ দেই যেসব মায়ের হৃদরোগের ঝুঁকি আছে তারা যেন অবশ্যই এমন হাসপাতালে ডেলিভারি করান, যেখানে আইসিইউ এর সুবিধা আছে। কার্ডিওলজিস্ট আছে। কেননা, সবকিছু হাতের কাছে না থাকলে মায়ের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।’