কতটা প্রস্তুত বিএনপির স্থায়ী কমিটি?

স্টাফ রিপোর্টার :দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনার চেষ্টা এবং একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির ওপর। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, এই দুই ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জন্য স্থায়ী কমিটিকে আরও কিছু বিষয়ে কাজ করতে হবে। কমিটিকে নজর দিতে হবে সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কোন্দল নিরসন, সঠিক রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের ওপর। এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে স্থায়ী কমিটির সঠিক সিদ্ধান্তই পারবে বিএনপিকে ঘুরে দাঁড় করাতে।

আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত এবং তাদের রাজনৈতিক কৌশল বিষয়ে সঙ্গে কথা হয় দলটির কয়েক স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের। তাদের অনেকেই মনে করছেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে অন্যতম দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দলটি। আর এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন স্থায়ী কমিটির বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। কেউ কেউ বলেছেন, আন্তর্জাতিকভাবেও যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে নির্বাচনের আগে।

নেতাকর্মীরা বলছেন, গত ৮ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারপারসন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর দলীয় শীর্ষনেতারা ঐক্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচন মোকাবিলা করতে এই ঐক্যে ভরসা পাচ্ছেন না অনেকেই। তাদের মূল্যায়ন, এই ঐক্য দৃশ্যমান। একইসঙ্গে সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টিও অনেকটাই প্রকাশ্যে।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ একাধিক নেতা জানান, বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে অবশ্যই স্থায়ী কমিটিকে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। গৃহীত যৌথ সিদ্ধান্ত সবাইকে মেনে চলতে হবে। চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতির কারণে মহাসচিবকে আরও বেশি দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। সাংগঠনিক কার্যক্রমে জবাবদিহি চালু করতে হবে। দিনে-দিনে চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে গতি দিতে হবে এবং এক্ষেত্রে শীর্ষনেতাদের অগ্রভাবে উপস্থিত থাকতে হবে।

স্থায়ী কমিটির এক উচ্চপর্যায়ের সূত্র (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আওয়ামী লীগের শাসন থেকে বেরিয়ে আসা। আর এই কাজটির জন্য এখন পর্যন্ত জেলেবন্দি খালেদা জিয়ার ওপর নির্ভরশীল বিএনপি। দলের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে, খালেদা জিয়া কী চান?’ সূত্রের ভাষ্য, বিএনপিতে এখন তিনটি স্তর। একটি হচ্ছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়, দ্বিতীয় সিনিয়র নেতাদের স্তর ও সর্বশেষ সাধারণ নেতাকর্মীরা। নীতিনির্ধারকদের বাইরে আপাতত দলের কৌশল সম্পর্কে অন্ধকারে বাকি সবাই। বিশেষ করে সিনিয়র নেতাদের প্রায় সবাই নির্বাচনে আসন প্রাপ্তি নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের প্রভাবশালী এক সূত্রের দাবি, বিএনপির প্রাথমিক চিন্তা দেশের ১৫১টি আসন নিয়ে। ভোটব্যাংকের হিসাবে এসব আসনে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। এক্ষেত্রে বাকি ১৪৯টি আসন বণ্টন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঐক্যের প্রশ্ন রয়েছে।

‘স্থায়ী কমিটিকে আরও সুনির্দিষ্ট হতে হবে’

বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন, আগামী দিনের আন্দোলন বা নির্বাচন মোকাবিলার বিষয়টিকে হালকাভাবে না নিয়ে এখন থেকে স্থায়ী কমিটিকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।  একাধিক ভাইস-চেয়ারম্যানের অভিযোগ, স্থায়ী কমিটির একটি লিখিত রেজ্যুলেশন বুকও নেই। প্রত্যেকটি সভায় কী কী আলোচনা হয়, কে কী বলেন, এসবের কোনও লিখিত ডকুমেন্টস নেই।

আরেক ভাইস-চেয়ারম্যানের ভাষ্য, স্থায়ী কমিটির দুই-তিনজন ছাড়া বাকিরা নিজ উদ্যোগে দলের কাজে যুক্ত হচ্ছেন না। আর এই অনীহাই একসময় কাল হয়ে দাঁড়াবে, এমন অভিমত তার। এছাড়া বর্তমানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সেন্টার পয়েন্ট’ নেই বলেও মনে করেন তিনি।

বিএনপির রাজনীতির পর্যবেক্ষক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘জাতির দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির অবস্থা শুধু বক্তৃতা নির্ভর। খালেদা জিয়া জেলে, তারেক রহমান বিদেশে। নেতৃত্বশূন্যতার কারণে তাদের জেনারেল সেক্রেটারি ছাড়া অ্যাক্টিভিটি খুব কম। স্থায়ী কমিটিকে প্রতিদিন বৈঠক করে রাজনীতি বিশ্লেষণ করে কাজটা করতে হবে।’

‘শীর্ষনেতাদের অগ্রভাগে থাকতে হবে’

আগামী দিনের আন্দোলনে সফলতা অর্জনের জন্য দলের স্থায়ী কমিটিসহ সিনিয়র নেতাদের অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে, সরাসরি সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করেন ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন, ‘অ্যাকশনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। দলকে সংগঠিত করতে দলের কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার কোনও বিকল্প নেই।’

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, খালেদা জিয়া ৮ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে আরও বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানো রাজনৈতিকভাবে প্রয়োজন ছিল। এরপর ধীরে-ধীরে প্রতিক্রিয়ার ধরন পাল্টানোর দরকার ছিল। এই ‘ব্যর্থতার’ জন্য কেউ-কেউ আঙুল তুলছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর। সুনামগঞ্জ জেলার একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় বিএনপি নেতা ফুল মিয়া বলেন, ‘স্থায়ী কমিটির কাছে আশা করি, তারা যদি ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং দালালি না করেন, তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমে ম্যাডামকে মুক্ত করা সম্ভব। নির্বাচনের দুই মাস আগেই তাকে মুক্ত করতে হবে। এছাড়া কিচ্ছু হবে না। ভালোভাবে রাজপথে না নামলে কিছু হবে না। স্থায়ী কমিটিকে রাজপথে নেমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা যদি সঠিক নিয়তে মাঠে নামেন, অবশ্যই তৃণমূল মাঠে নামবে।’ ঢাকা মহানগর ছাত্রদল (উত্তর) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম রবিনের অভিযোগ, ‘অবৈধ এই সরকারের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে সব আন্দোলনের আগে সিনিয়র নেতারা সরকার পতনের বড় বড় কথা বলেছিল। পরে গাঢাকা দিয়েছে এবং তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ রাজপথে সক্রিয় ছাত্রদলের এই নেতার প্রশ্ন, ‘কেন সিনিয়র নেতারা কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে রাজপথে অবস্থান নিচ্ছেন না। পুলিশ কর্মীদের দেখলেই গুলি করে। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, সব সিনিয়র নেতাকে রাজপথে দেখলে পুলিশ গুলি করতো না।’ ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর বহির্বিশ্বের প্রভাব তো আমরা ক্রমাগত দেখছি। এটাও বিএনপিকে কভার করতে হবে।’

‘সাংগঠনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে’

 

দলের কেউ-কেউ স্থায়ী কমিটির পাশাপাশি মহাসচিবের আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার পক্ষে কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, সাংগঠনিকভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জবাবদিহির উদ্যোগ নিতে হবে। সম্প্রতি সর্বশেষ আয়োজিত যৌথসভায় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করেছেন, ‘কেন্দ্র থেকে অনেক নেতাকে জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে অঘটন ঘটতে পারে। অনেকে সাংগঠনিক কাজে যুক্ত হতে অনীহা প্রকাশ করলেও লাভবান কাজে নিজ উদ্যোগে সম্পৃক্ত হন।’ জবাবে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘যারা কেন্দ্রীয়ভাবে সক্রিয় থাকেন শুধু তাদেরই স্থানীয়ভাবে যুক্ত না হতে চিঠি দেওয়া হবে।’

বিএনপির সাংগঠনিক একটি সূত্রে জানা গেছে, সাংগঠনিক পুনর্গঠন কাজের দায়িত্ব দেওয়া রয়েছে ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাজাহানের ওপর। ২০১৬ সালের কাউন্সিলের আগে থেকেই এ দায়িত্বে আছেন তিনি। যদিও প্রায় সবগুলো কমিটির মাত্র আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলার  নেতা ও প্রভাবশালী একজন ভাইস-চেয়ারম্যান বলেন, ‘পুরো দেশের কমিটি করতে কয় মাস সময় লাগে? এক মাস বা দুই মাস। নির্বাচনের আগে, আন্দোলনের আগে অবশ্যই মানুষ ও কর্মীদের আস্থায় থাকা নেতাদের দায়িত্বের অংশ করে দিতে হবে। এটা শুধু একজনের কাছে বন্দি রয়েছে। এই কাজের কোনও জবাবদিহি নেই।’

তবে এ বিষয়ে কথা কয়েকদিন চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি বিএনপির কমিটি গোছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত ভাইস-চেয়ারম্যান মো. শাজাহানের সঙ্গে।  ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘কমিটিতে ব্যক্তিগত বা পকেটের লোক নেওয়া যাবে না। নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার মূল্যায়ন করতে হবে। তাহলে সাফল্য আসবে।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘আগামী নির্বাচন ও ম্যাডামের মুক্তির বিষয়ে পুরো দলই সক্রিয়। ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। আগামী দিনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি কেমন, সেটা মুখপাত্র বলবেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা পুরোটাই সম্ভব। এটা শুনতে হাইপোথেটিক্যালি হলেও সম্ভব।’ নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য বলেন, ‘নির্বাচন প্রশ্নে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেবেন। তবে সমমনা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৃহৎ ঐক্য স্থাপনের ওপর নির্ভর করছে স্থায়ী কমিটির সক্ষমতা।’