মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত আরো ৮

সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে বুধবার দিবাগত রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত  পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ পাঁচ জেলায় ৮ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মাগুরা ২ জন, কুমিল্লায় ২ জন , ফেনীতে ২ জন এবং নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন করে মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

র‍্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে আরো দাবি করা হয়, নিহতরা সবাই মাদক ব্যবসায়ী। ‘বন্দুকযুদ্ধের’ সময় অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন- মাগুরা পৌর এলাকার নিজনান্দুয়ালী গ্রামের মাদক ব্যবসায়ী আইয়ুব হোসেন (৫০) ও ভায়না টিটিডিসিপাড়ার মাদক বিক্রেতা মিজানুর রহমান কালু (৪৩)।

সদর থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন জানান, বুধবার মধ্যরাতে মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালি হাউজিং প্রজেক্ট এলাকায় দুদল মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে গোলাগুলির খবর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। পরে তাদেরকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মাগুরা সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে তাদের মৃত্যু হয়। বিভিন্ন থানায় নিহত আইয়ুবের নামে ১৮টি এবং কালুর নামে ২১টি মাদকের মামলা রয়েছে।

কুমিল্লা :

জেলার সদর ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় পৃথক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন-চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বৈদ্দেরখিল গ্রামের হাফেজ আহাম্মদের ছেলে বাবুল প্রকাশ ওরফে লম্বা বাবুল (৩৮) ও সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়িসংলগ্ন চাঙ্গিনী গ্রামের মৃত শাহ আলমের ছেলে রাজীব (২৮)।

চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি মো. আবুল ফয়সাল জানান, মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে বুধবার  পৌর এলাকার রামরায় এলাকা থেকে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী বাবুলকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, তার একটি মাদকের চালান উপজেলার আমানগণ্ডা এলাকায় রয়েছে। পরে বাবুলকে নিয়ে আমানগণ্ডার নতুন রাস্তার মাথার মন্তাজের বাগানে রাত ১টার দিকে অভিযানকালে বাবুলের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় পুলিশও আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি চালায়। উভয়পক্ষের গোলাগুলিতে বাবুল আহত হন। পরে আহত বাবুলকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি এলজি ও ২০০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত বাবুলের বিরুদ্ধে মাদক আইনে পাঁচটি মামলা রয়েছে ।

অন্যদিকে জেলার সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম জানান, বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন ট্যাংক রোডের গোয়ালমথন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় মাদক ব্যবসায়ীরা একটি প্রাইভেটকারে মাদকদ্রব্য নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে রাজীব (২৫) ও তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় আত্মরক্ষায় পুলিশও গুলি চালায়। এতে গুলিবিব্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন রাজীব। আহত রাজীবকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে কার্তুজসহ একটি এলজি, ৫০ বোতল ফেনসিডিল এবং ৪০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত রাজীবের বিরুদ্ধে থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া :

আখাউড়ায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে মাদক ও হত্যা মামলার এক আসামি নিহত হয়েছেন। বুধবার দিবাগত রাতে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আমির উপজেলার চানপুর এলাকার মৃত সুরুজ খাঁর ছেলে।

আখাউড়া থানার ওসি মোশারফ হোসেন তরফদার জানান, বুধবার রাতে পুলিশের একটি দল বনগজ স্টিল ব্রিজসংলগ্ন পাকা রাস্তার মোড়ে মাদকবিরোধী অভিযানে যায়। এ সময় আমির খাঁ ও তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এ সময় সহযোগীদের গুলিতে আমির খাঁ নিহত হন। নিহত আমিরের বিরুদ্ধে আখাউড়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি ও একটি হত্যা মামলাসহ ১২টি মামলা রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পাইপগান, একটি কার্তুজ, একটি রামদা, ১০ কেজি গাঁজাসহ আটটি স্কফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ :

সিদ্ধিরগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে  সেলিম ওরফে ফেন্সি সেলিম নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার ভোর ৩টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের দক্ষিণ নিমাইকাসারী ক্যানেলপাড় বজলুখানের খালি জায়গায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত সেলিম ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাসারী বাঘমারা এলাকার আবুল কাশেম ওরফে গাঞ্জা কাশেমের ছেলে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুস সাত্তার জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ফেন্সি সেলিমকে মাদক বিক্রির সময় হাতেনাতে ধরতে মৌচাক এলাকায় অভিযানে গেলে সেলিম ও তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি করে। এ সময় ঘটনাস্থলেই সেলিম নিহত হয়। সেলিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১৫টি মাদক মামলা রয়েছে। কাশেম এলাকায় গাঁজার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।

ফেনী :

ফেনীর ফুলগাজীতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার সীমান্তবর্তী জাম্বুড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন- সামিরান শামীম উপজেলার আনন্দপুর মাইজ গ্রামের মোহাম্মদ মোস্তফার ছেলে ও অপরজন মনতলা গ্রামের মৃত ফটিক মিয়ার ছেলে মজনু মিয়া ওরফে মনির।

ফুলগাজী থানার ওসি হুমায়ুন কবির জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সীমান্তবর্তী ওই এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মাদক বিক্রেতারা গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি ছুড়লে দুই মাদক বিক্রেতা আহত হন। পরে তাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে তাদের মৃত্যু হয়।

ঘটনাস্থল থেকে ২০০ বোতল ফেনসিডিল ও ৭০০ পিস ইয়াবা, একটি পিস্তল ও একটি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১০টিরও বেশি করে মামলা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, চলতি মাসের ৪ মে থেকে চলা মাদকবিরোধী অভিযানে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদেশে ৪৩ ব্যক্তি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সোমবার দিবাগত রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ১১ জন, রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ৮ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া গত ১৫ মে দুই জন, ১৭ মে তিনজন, ১৮ মে একজন, ১৯ মে ৩জন ও ২৩মে ৭জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার আরো ৮ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, নিহতরা মাদক ব্যবসায়ী। এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। বিএনপি একে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছে।