একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে একক সিদ্ধান্ত নেবে না বিএনপি

স্টাফ রিপোর্টার : একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া-না নেওয়া নিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেবে না বিএনপি। এ ক্ষেত্রে দলটি চার ধরনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চায়। সবক্ষেত্রেই সরকারবিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার বিষয়ে আলোচনা চলছে দলটিতে। তবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া-না নেওয়া—এই ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আরও পরে। এ বিষয়ে দলের যৌথ বৈঠক হবে। ওই  বৈঠকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত জেনেই অবস্থান পরিষ্কার করবে বিএনপি। দলটির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমি মনে করি বিএনপি নির্বাচনে যাবে। দলের চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তেই যাবে। এক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি। তবে আমাদের মূল ফোকাস এখন খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে। তাকে নিয়ে আমাদের সব চিন্তা।’ সূত্র জানায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাকি দলগুলোর আগ্রহের মাত্রা দেখে শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত জানাবে বিএনপি। সবক্ষেত্রেই কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করা হবে।

সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নির্ভর করছে দু’টি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ হওয়ার সবরকম বাস্তবতা থাকলে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দলটির দাবি অনেকাংশে মেনে নেওয়া হলে। দ্বিতীয়ত, সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলে শেষ মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত জানাবে বিএনপি। বিশেষ করে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্না ও বামদলগুলোর নেতারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে মত দিলেই বিএনপিও অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে। এক্ষেত্রে মানুষের কাছে ব্যাখ্যা থাকবে দলটির—গণতন্ত্ররক্ষা ও নির্বাচনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচন বর্জন করার পেছনেও দু’টি বিষয়ের ওপর লক্ষ রাখবে বিএনপি। প্রথমটি, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিলে বিএনপিও নির্বাচনি লড়াইয়ে যুক্ত হবে না। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল আবারও ৫ জানুয়ারি’র মতো নির্বাচন করলেও রাজনৈতিক বিজয় শেষে বিএনপির দিকেই হেলবে, এমন আত্মবিশ্বাস নেতাদের।

বিএনপিনেতারা মনে করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগ এখনও বিএনপির সমকক্ষ কাউকে তৈরি করতে পারেনি। ফলত, নির্বাচনি প্রক্রিয়া দলবান্ধব করলেও আদতে দেশে-বিদেশে আগের নির্বাচনের মতো প্রশ্ন থাকবে। একজন সিনিয়র নেতার ভাষ্য, প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে এই অবস্থায় রেখে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করতে পারবে না।

জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘সরকার চাইলেও রাজনৈদিক দলগুলো নির্বাচন বয়কট করবে না। নির্বাচনের বিষয়টি সামনে এলে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে।’

সূত্রের ভাষ্য, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা বর্জন বিষয়টিকে পরিবেশ-উত্তর বিষয় হিসেবে রেখে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। আর এই চেষ্টাই চলছে দলটিতে। আলোচনা চলছে সমমনা রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে। তবে আন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান খোদ স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। তার মতে, ‘আন্দোলনের কোনও সম্ভাবনা নেই। এই সরকারের বিরুদ্ধে ডাকাত আর সন্ত্রাসী ছাড়া কেউ আন্দোলন করে টিকতে পারবে না।’ যদিও কোনও-কোনও সূত্রের দাবি, বিএনপি শেষ পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটই ধরে রাখতে পারবে না।  বিশেষ করে জোটে শেষ পর্যন্ত জামায়াত নাও থাকতে পারে—এমন আশঙ্কাও থাকছে। যদিও সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার হাতে বিএনপির নেতৃত্ব আছে, ততক্ষণ ঐক্য নিয়ে জামায়াতের দুশ্চিন্তা নেই।’

সূত্রের ভাষ্য, বিএনপি শেষপর্যন্ত নির্বাচনের বিষয়ে আন্তরিক। আর এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের মতো সিদ্ধান্ত কেবল খালেদা জিয়ার কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন দলটির নেতাকর্মীরা। এর বাইরে সিদ্ধান্ত এলে তা নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে—এমনটি ভাবছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

একটি সূত্র বলছে, খালেদা জিয়ার একক সিদ্ধান্তই বিএনপির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। বিশেষ করে, স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্যের পরামর্শ না নিয়ে তার পক্ষ থেকে সরাসরি নির্দেশনাই শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান করবে—এমন প্রত্যাশা অনেক নেতার। তারা এও মনে করেন, ‘সব দল নির্বাচনে অংশ নিলে, ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ভোট কারচুপি বা নির্বাচনে একচ্ছত্র প্রভাব ফেলা কঠিন হবে। একইসঙ্গে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তেমনটি করা সম্ভব  হবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল¬াহ আল নোমান বলেন, ‘নির্বাচন তো সুষ্ঠু ও অবাধ হয় না। নির্বাচন কীভাব মোকাবিলা করবো, সেটা যৌথ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এটা আমি আলাদাভাবে বলতে পারবো না। নির্বাচন নিয়ে যৌথ সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন করা তো স্বাভাবিক, কিন্তু খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সংশয় তৈরি করেছে, এটা পরিষ্কার করতে হবে।’

বিএনপির এই ভাইস চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমরা এখনও আশাবাদী। ক্ষমতাসীনরা শেষমুহূর্তে হলেও বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। দেশের অবস্থা খুব নাজুক। এই নাজুক পরিস্থিতিতে তারা অনির্বাচিত সরকার টিকে থাকতে পারে না।’