বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার দায়িত্ব অস্বীকার করেছে মিয়ানমার: জাতিসংঘে বাংলাদেশ

মর্যাদা-অবস্থান নির্বিশেষে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। সবশেষ রোহিঙ্গা সংকটে বিষয়টি আবারও প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের কূটনীতিক মাসুদ বিন মোমেন। মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদে ‘সশস্ত্র সংঘাতে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা’ বিষয়ে উন্মুক্ত বিতর্ক চলাকালে এসব কথা বলেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি।

বক্তৃতায় মিয়ানমারের নাম উল্লেখ না করে মাসুদ বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে বিশ্ববাসী একটি নির্যাতিত সংখ্যালঘু জাতিকে জোরপূর্বক বিতাড়িত হতে দেখেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ দাবি করছে তারা চরমপন্থী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি যদি তাদের দাবি মেনেও নেই, তাহলেও সংশ্লিষ্ট দেশটি নিজ সীমানার মধ্যে থাকা সব বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালনে অক্ষমতা বা অনিচ্ছা দেখিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।’

বিতর্কে অংশ নিয়ে লিচটেনস্টেইনের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ওয়েনাবেসার বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি নৃশংসতার সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণগুলোর মধ্যেই আছে। নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি দলের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরকে তিনি স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘তবে সফর শেষে পরিষদের পক্ষ থেকে জরুরিভাবে কোনও পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি’।

ওয়েনাবেসার বলেন, ‘চলমান সংকটের দায়িত্বশীলতার মাত্রা নিয়ে কাউন্সিল ঘোষণা দেবে এমন লক্ষণ কমই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা।’

বিতর্কে অংশ নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, শুধুমাত্র ৭-১৪ মে’র মধ্যেই বাংলাদেশে থাকা ৭ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ঝড় অথবা ভূমিধসের কবলে পড়েছে। তিনি বলেন, সাধারণত বর্ষকালে কক্সবাজারে প্রায় আড়াই মিটার বৃষ্টিপাত হয়। এর ফলে ব্যাপক বন্যাও দেখা দেয়। তাই দেড় থেকে দুই লাখ শরণার্থী ও ৮৮৩টি সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়ি বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের মধ্যে ২৫ হাজার শরণার্থী মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘ সংস্থাগুলো এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে।

দুজারিক বলেন, আমরা দেখেছি বাংলাদেশ প্রতিবছর এসব সমস্যার মোকাবিলা করে। তারা এসব বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছে। তবে শরণার্থী শিবিরগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি পরিমাণ ও সুযোগের দিক দিয়ে অনন্য। এছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শরণার্থীদের সহায়তা ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, শরণার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য মূল ভূখণ্ডের আরও সমতল ভূমির প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে আমাদের দুর্যোগ প্রশমন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘সবশেষ রোহিঙ্গা মানবিক সংকট আমাদের আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট দেশটি মর্যাদা-অবস্থান নির্বিশেষে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।’

গত বছর জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা পুনর্ব্যক্ত করে মাসুদ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ সংস্থা বা আঞ্চলিক অংশীদারদের তত্ত্বাবধানে ‘সেফ জোন’ তৈরির আহ্বান জানান। নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘এ ধরনের রক্ষাকবচ না থাকলে জোর করে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবেন। এছাড়া তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্যও এটা প্রয়োজন।’

রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতিতেও মানবিক সহায়তা প্রবেশে বিধি-নিষেধ রয়েছে। এখনও রোহিঙ্গাদের জন্য খাবার ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। মাসুদ বলেন, ‘কিছু মৌখিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এমন নৃশংস অপরাধের কোনও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত বা বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’