আশঙ্কাজনক হারে দেশে বাড়ছে নারী নির্যাতন

 দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা। এ ঘটনা দিনকে দিন, বছরকে বছর বেড়েই চলেছে। নারী ও শিশুর প্রতি নির্মম নির্মমতা ও ন্যক্কারজনক নির্যাতনে হতবাক বিবেকবান মানুষ। ঘটছে। বাদ যাচ্ছে না বয়স্ক নারী থেকে ৪ বছরের কন্যাশিশুও। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের পর নির্যাতন করে হত্যা করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে এ ধরনের নির্মম নির্যাতন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত দশ বছরে মোট ধর্ষণ কর হয়েছে ৮০৭০জন। ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা করা হয়েছে ৮৯২ জনকে যা প্রতিবছরই বেড়েই চলেছে। ২০০৮ ধর্ষণ ও গণধর্ষণ সংখ্যা ছিল ৪৩৯ জন, ২০০৯ তে ৫৩৯ জন, ২০১০ তে ৭০০ জন, ২০১১ তে ৮০০ জন, ২০১২ তে ৬৬৫ জন, ২০১৩ তে ৮৮১ জন, ২০১৪ তে ৮৪০ জন, ২০১৫ তে ১০০৭ জন, ২০১৬ তে ১০০৬ জন, ২০১৭ তে ১১৯৩ জন, ২০১৮ এর চার মাসে ২৪৮ জন। ২০১৩ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ধর্ষণ ও গণর্ধষণের শিকার হন ৪৯২৭ জন নারী; পাঁচ বছরে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭৫৫ জনকে; হত্যা ৩৯০০জন; উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছে ১২৯ জন; গৃহপরিচারিকা আত্মহত্যা ৬৮ জন; গৃহপরিচারিকা হত্যা ১৫২ জন; যৌতুকের কারণে হত্যা ১০৩৭ জন, বাল্যবিবাহ ৬২৮। এছাড়া শ্লীলতাহানি, শারিরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রায় দশ হাজার জন নারী।

২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ধর্ষণ ও গণর্ধষণের সংখ্যা ছিল ৩১৪৩ জন; উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা ৭১জন; গৃহপরিচারিকা আত্মহত্যা ১৮ জন; গৃহপরিচারিকা হত্যা ১৩০জন; বাল্যবিবাহ ৩২৯। তবে কমে এসছে নারী ও শিশু পাচার। ২০১৩ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত পাচার হয়েছে ১৭১ জন যা ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ছিল ৯১৪ জন।

এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে ধর্ষণ বেড়েছে দেড়গুণ; উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা প্রায় দুইগুণ; গৃহপরিচারিকা আত্মহত্যা চারগুণ; বাল্যবিবাহ দ্বিগুণ। আর বিগত দশ বছরে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রায় পঞ্চাশ হাজার নারী ও কন্যাশিশু। এ বছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত চার মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৩৪৫ জন নারী ও শিশু। যার মধ্যে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩১০ জন, হত্যাকা-ের শিকার ১৮০জন, আত্মহত্যা করেছে ১০৭জন, ধর্ষণের পর হত্যা ১৬ জন, অপহরণ ও যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ৯২জন, শারিরিক নির্যাতন করা হয়েছে ১৩১জনকে।

বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজ ও নারী আন্দোলনকারীদের মতে- প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, প্রশাসনের ব্যর্থতা, তদন্তে ধীরগতি, বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ার কারণ। এছাড়া আইনী দুর্বলতার কারণে পার পাওয়ায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। ফলে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ ‘ধর্ষণ’ ঘটনাটি ঘটছে পাল্লা দিয়ে। নারী উন্নয়ন শক্তির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ডা. আফরোজা পারভীন বলেন, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং এতে রাজনীতিবিদদের অংশগ্রহণ করাতে হবে। তাহলে দ্রæত নারী নির্যাতন কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি বলেন, কোন মেয়েকে যখন ইভটিজিং করা হয় তখন থেকেই প্রতিরোধ শুরু করতে হবে তাহলে তা ধর্ষণ পর্যন্ত গড়াবে না।

মহিলা ও শিশু-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক আবুল হোসেন বলেন- সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, গণমাধ্যমে প্রচার সব মিলিয়ে আগে মানুষ যে বিষয়গুলোকে নির্যাতন বলেই মনে করত না, এখন তা যে নির্যাতন, সেই সচেতনতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে নির্যাতন নিয়ে মানুষ মুখ খুলতে শুরু করেছে। ফলে নারী নির্যাতনের সংখ্যাটি বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নারী অধিকার কমিটির চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহফুজা খানম বলেন, আগের তুলনায় নারী নির্যাতনের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। দেশের নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়েছেন, তা যেমন সত্য; তেমনি নির্যাতন পিছু ছাড়ছে না, তা-ও সত্য। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, ডিজিটাল সংস্কৃতি, আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়া, ধনতান্ত্রিক সমাজের অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে নির্যাতন বাড়ছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, নারী নির্যাতন বন্ধে অনেকগুলো ভালো আইন থাকলেও সেগুলোর প্রচার ঠিকমত হচ্ছে না। তাছাড়া আইন প্রয়োগেও নানা সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধীদের শাস্তি দিতে দেরি হচ্ছে৷ এছাড়া প্রভাবশালীরা আইন প্রয়োগের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকেন৷

মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক সাহিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, নারী নির্যাতন বাড়ার পেছনে প্রশাসনের দুর্বলতাও একটি বড় কারণ। অনেক ঘটনায় তারা দোষীদের আটক করে না। কিন্তু তারা চাইলে পারে। সে ক্ষমতা তাদের আছে। আমি মনে করি, নারী নির্যাতন ঠেকাতে পুলিশের একটি শক্ত ভ‚মিকা নিতে হবে।

তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী নারী নির্যাতন বাড়ার কারণ হিসেবে বলেন- তরুণ সমাজের মধ্যে অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বেকার সমস্যা এবং মাদকও একটি বড় কারণ। এ ছাড়া যে হারে অপসংস্কৃতির প্রসার হচ্ছে আমরা সেগুলোর লাগাম টানতে পারছি না। এ সব কারণেই ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে।