ছাত্রলীগে ‘সিন্ডিকেট’ মুক্ত যোগ্য নেতৃত্বের অপেক্ষা

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলনের (১১ ও ১২ মে) পর পেরিয়ে গেছে এক সপ্তাহেরও বেশি সময়। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি নতুন নেতৃত্বের নাম শোনার অপেক্ষা। কারা আসছেন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে? এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা চললেও সবাই তাকিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে। ছাত্রলীগের সাবেক ও পদপ্রত্যাশী নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের একমাত্র অভিভাবক। তিনি ছাত্রলীগকে একদিকে ‘সিন্ডিকেট’ ও অনুপ্রবেশকারী মুক্ত করবেন, অন্যদিকে নতুন করে যেন ‘অন্য সিন্ডিকেট বা বলয়ের’ মধ্যে না পড়ে সেদিকেও লক্ষ রাখবেন। তিনি অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন এবং যোগ্যদেরই দায়িত্ব দেবেন।

শেখ হাসিনার নির্দেশ মতো সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি করতে ব্যর্থ হয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী সবার নামের তালিকা গণভবনে দিয়ে এসেছেন ছাত্রলীগের সদ্য বিদায়ী কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন। সেদিন প্রধানমন্ত্রী তাদের পরে কমিটি ঘোষণার কথা জানিয়েছিলেন। সূত্র জানায়, ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিচ্ছেন শেখ হাসিনা। নিজস্ব টিম এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সম্ভাব্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ব্যাপারে অনুসন্ধান করে চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বেশ কয়েক নেতার কাছ থেকেও তিনি নাম নিয়েছেন। এখন বিভিন্নভাবে প্রার্থীদের ব্যাপারে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। খুব শিগগিরই ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করা হবে।

এদিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম কিনেছেন এমন বেশ কয়েক নেতা তাদের সঙ্গে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছেন। মানবকণ্ঠকে তারা বলেন, বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার লোক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এবং তাদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলার পাশাপাশি সিভিও জমা নিয়েছেন। এ ছাড়া এদের দু’একজনের এলাকার বাড়িতেও বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ-খবর নেয়া হয়েছে বলে জানান তারা।

ছাত্রলীগের সদ্য বিদায়ী কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, প্রার্থীদের তালিকা আমরা আমাদের অভিভাবক জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে জমা দিয়েছি। নতুন নেতৃত্ব যত দ্রুত সম্ভব আমাদের নেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের উপহার দেবেন। দেশরতœ শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আমাদের একমাত্র অভিভাবক আস্থার ঠিকানা, তার ওপর আমাদের সবার শতভাগ আস্থা বিশ্বাস রয়েছে। নতুন নেতৃত্বের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মেনে নেবে ছাত্রলীগ। দু’একদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগকে নতুন কমিটি উপহার দেবেন। আমরা তার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।

এ বিষয়ে পদ প্রত্যাশী উপগ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন শাহাদাত বলেন, আপা সময় নিয়ে কমিটি দিলে বিচক্ষণ ও যোগ্য নেতৃত্বই বের হয়ে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা আপার দেয়া সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করব। উপআপ্যায়ন সম্পাদক আরিফুজ্জামান আল ইমরান বলেন, আপা যাচাই-বাছাই করে কমিটি দিলে ছাত্রলীগের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে। এর জন্য সময় লাগলেও বিষয়টিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা আপার দেয়া সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। ওনার সিদ্ধান্তকে আমরা চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করব।

ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের চাওয়া- ছাত্রলীগকে ‘সিন্ডিকেট’ মুক্ত করে ও জঞ্জাল ও অনুপ্রেবেশকারী মুক্ত করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ছাত্রলীগের একমাত্র অভিভাবক আখ্যায়িত করে তারা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। বর্তমানে ছাত্রলীগ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। সিন্ডিকেট ও অনুপ্রবেশকারী নিয়ে যে বিতর্ক এবার তার অবসান হবে। আবার নতুন করে ছাত্রলীগ যেন নতুন কোনো সিন্ডিকেটের কবলে না পড়ে সে দিকেও তিনি নজর রাখবেন।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা যিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকম-লীর সদস্য তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, ছাত্রলীগ নিয়ে আর কেউ যেন ‘খেলাধুলা’ করতে না পারে সে জন্যই নেত্রী (শেখ হাসিনা) এবার নিজেই নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। দেশের ছাত্র সমাজ এবং আমরা এখন তার সিদ্ধান্তের দিকে চেয়ে আছি। তার সিদ্ধান্তে কোনো ভুল হবে না। যোগ্য, মেধাবী ও পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনা করেই তিনি ছাত্রলীগের নেতা চূড়ান্ত করবেন।

এদিকে ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি পদে ১১১ ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্যে ২১২ প্রার্থী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদের জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা ৩২৩ প্রার্থীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন বলে জানা গেছে। নেতা হিসেবে দায়িত্ব তুলে দেয়ার আগে প্রার্থীদের রাজনৈতিক মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার পরীক্ষা নিতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বুধবার রাতে গণভবনে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। জানা যায়, সেখানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও ছাত্রলীগের সদ্য বিদায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেয়া শেষে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আবারো বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।

ছাত্রলীগে বয়স বিতর্ক: গঠনতন্ত্রে ছাত্রলীগের নির্ধারিত বয়স কাঠামো অনূর্ধ্ব ২৭ বছর পর্যন্ত। গঠনতন্ত্র অনুসারে এই বয়সের মধ্যে যারা আছেন তারা ছাত্রলীগের পদে থাকতে পারবেন। কিন্তু বিগত কমিটিগুলোর সম্মেলন নির্ধারিত সময়ে না হওয়ায় এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ২৮তম সম্মেলনের আগে তিনি দুই বছর গ্রেস দিয়ে বয়স ২৯ বছর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এবার ২৯তম জাতীয় সম্মেলনে তিনি ২৮ বছর বয়স নির্ধারণ করে দেন। বলেন, ছাত্রলীগের বয়স আমরা ২৭ বছর করে দিয়েছিলাম। দুই বছরমেয়াদি কমিটির মেয়াদ ৯ মাস বেশি হয়ে গেছে। আমি চাই না এই ৯ মাস বেশি হয়েছে বলে কেউ বঞ্চিত হোক। কাজেই এটাকে আমরা এক বছর গ্রেস দিতে পারি। কাজেই ২৮ বছরের মধ্যে আছে যারা তারাই হবে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর দলের কেন্দ্রীয় কয়েক নেতা তার সঙ্গে দেখা করেন। সেদিন বিভিন্ন সূত্রে বরাত দিয়ে বেশ কিছু গণমাধ্যমে খবর আসে ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাদের দাবির প্রেক্ষিতে ছাত্রলীগের বয়স অনূর্ধ্ব ২৯ বছর বা ২৮ বছর ৩৬৪ দিন’ নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু এই ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কোনো নেতা বা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোয় এ নিয়ে দ্বৈত ভাবনা শুরু হয়েছে। নেতৃত্ব বাছাইয়ে বয়সের সীমা নিয়েও কৌতূহল থেকেই গেছে।

পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ চলছে: এদিকে নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা না হওয়ায় এখনো দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রেখেছেন ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশী নেতারা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা-মন্ত্রীদের (বিশেষ করে যারা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কর্মীবাহিনী নিয়ে যোগ দিচ্ছেন তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনে ভালো যোগাযোগ আছে বলে খ্যাত এমন নেতা বা ব্যক্তিদের কাছেও ধরনা দিচ্ছেন অনেকেই। কিছুটা সময় বেশি লাগলেও তারাও বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই যোগ্য ও দক্ষদেরই নেতৃত্বে আনবেন।

ছাত্রলীগের আগামীর নেতৃত্ব নির্বাচন প্রসঙ্গে সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ছাত্রলীগের শীর্ষ পদে প্রার্থী অনেক। কমিটির শীর্ষ পদে যাতে অযাচিত কেউ অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে জন্য অধিকতর যাচাই-বাছাই চলছে। তড়িঘড়ি করে ছাত্রলীগের কমিটি করা হবে না। প্রধানমন্ত্রী যথা সময়ে এ কমিটির ঘোষণা দেবেন। তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে নামের যে তালিকা গেছে তাতে প্রার্থী অনেক, নারীদেরও নাম আছে। তবে সবকিছুই প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করছে। যেহেতু প্রার্থী বেশি তাই যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।