সাভারে লাইসেন্সবিহীন ঔষধ ব্যবসা জমজমাট, ফার্মেসীগুলো নিম্নমানের ঔষধে সয়লাব

স্টাফ রিপোর্টার : সাভারের বিভিন্ন হাট বাজারে অশিক্ষিত, প্রশিক্ষণবিহীন, ড্রাগ সাইসেন্সবিহীন গড়ে উঠছে শতশত ফার্মেসী। সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং রহস্যজনক নীরবতার কারণে মালিক ও কর্মচারীরাই ডাক্তার বনে গেছেন। ফলে সরকার হাজার হাজার টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর প্রতারিত হচ্ছে অসহায় জনসাধারণ।

জানা যায়, সাভার উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সাভার উপজেলা। যার মধ্যে বাড়ইপাড়া, কবিরপুর, জিরানী, চক্রবর্তিরটেক, মুজারমিল, শ্রীপুর, বলিভদ্র, ভাদাইল, বাগবাড়ি, গোরাট, দিয়াখালি, বাংলাবাজার, জামগড়া, নসিংহপুর, জিরাবর, আশুলিয়া, ঘোসবাগ, বাইপাইল, পল্লিবিদ্যুৎ, ডেন্ডাবর, নবীরগর, নয়ারহাট, সাভার বাসস্ট্যান্ড, থানাস্ট্যান্ড, হেমায়তপুর, আমিনবাজারসহ উপজলার বিভিন্ন ছোট-বড় হাট-বাজার এবং ালিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় সহস্রাধিক ফার্মেসী ও হতুড়ে ডাক্তার। যার অধিকাংশের কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লাইসেন্সধারী কিছু ঔষুধের দোকানে লাইসেন্স রয়েছে। তার মধ্যে যে কয়েকটির লাইসেন্স আছে তাদের আবার অনেকেরই নবায়ন নেই।

আশুলিয়ার বিভিন্ন ফার্মেসী ঘুরে দেখা যায়-ঔষধ প্রশাসনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শুধু ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে অনেকেই ফার্মেসী দিয়ে বসে পড়েছেন ঔষধ বিক্রির জন্য। এসব ফার্মেসীর অধিকাংশতেই নি¤œমানের এবং মেয়াউত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রি করছে। এদের অনেকেই আবার বিভিন্ন ক্লিনিকের দালাল। এলাকায় কেউ অসুস্থ্য তাদের কাছে আসলে তারা কিছু ঔষধ দিয়ে জটিল রোগ জানিয়ে দ্রুত পাঠিয়ে দেয় কমিশনপ্রাপ্ত ক্লিনিকে। শতশত লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসী এভাবে ঔষধ বিক্রির আড়ালে অপচিকিৎসা এবং ক্লিনিকগুলোর দালালি করছে। হাতুড়ে ডাক্তারদের ফাঁদে পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছে সাধারণ নিরীহ মানুষ। এ সব ফার্মেসীতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চ মাত্রার নিষিদ্ধ ও নিম্নমানের নানা প্রকার ঔষধ বিক্রি করছে অবাধে। এতে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক রোগী ও তাদের পরিবার-পরিজন। ফলে মানুষ প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে।

এদিকে লাইসেন্সবিহীন এলোপ্যাথিক ঔষধের পাশাপাশি আবার আয়ুর্বেদী ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ফার্মেসী খুলে বসেছে অনেকে। ইউনানী নামে হরমোন ও বিভিন্ন বোতলজাত ঔষধের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণ নেই। ইচ্ছামত দাম লিখে বেশি মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এরমধ্যে রয়েছে এইচ হরমোন ও নিশাত হরমোন ঔষধ। আর এই ঔষধের নকল ও মানহীনে ভরপুর হয়ে গেছে আশুলিয়া ঔষধ ফার্মেসী।

অনুসন্ধানে জানা য়ায়, বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানি থেকে বাকিতে ঔষধ ক্রয়-বিক্রয় সুযোগ থাকায় অনেকটা অল্প পুঁজিতে এ ব্যবসা করতে পারছে ফার্মেসীগুলো। এ কারণে জনবহুল উপজেলার বিভিন্ন এলাকাগুলোতে খুব সহজেই গড়ে উঠছে নতুন নতুন ফার্মেসী। ফার্মেসী পরিচালনার জন্য যে ন্যূনতম যোগ্যতা প্রয়োজন তাও আবার অধিকাংশের ফার্মেসীর মালিকদের নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব ফার্মেসীর অধিকাংশই ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের বাইরে ঔষধ বিক্রি করে থাকেন এবং রোগীদের বলে থাকেন একই গ্রুপের ঔষুধ ডাক্তার যেটা লিখেছেন তার চেয়েও ভালো। ফলে রোগীরা সরল বিশ্বাসে প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

অনেকে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে কোন ফার্মেসীতে রোলাক কিনতে চাইলে এক সঙ্গে রাখা কেটো রোলাক গছিয়ে দেওয়া হয়। খুচরা কিনতে চাইলে কাঁচি দিয়ে এমনভাবে কাটা হয় যাতে শুধু রোলাক লেখাটি চোখে পরে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষিত মানুষের পক্ষেও কারসাজি ধরা সম্ভব হয় না। ফার্মেসী কর্তাদের কারসাজিতে ৫ টাকার ওষুধ কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকায়। ফলে ঔষধের কোন কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যথা উপশমের আরও একটি ঔষধ রকেট। খুচরা বাজারে ১০টির প্রতি পাতার দাম ১০০ টাকা। প্রায় একই রকম দেখতে অন্য একটি ঔষধ ডমপ। এটির পতি পাতার দাম মাত্র ১৫ টাকা। এক সঙ্গে বেশি কিনলে আরও অনেক কমে পাওয়া যায়। এ দুটি ওষুধের মোড়ক দেখে পার্থক্য করা কঠিন। কিন্তু একটির বদলে অন্যটি ক্রেতাকে গছিয়ে দিলে মুনাফা পাওয়া যায় চার-পাঁচগুণ।

জানা যায়, একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট দ্বারা একটি ফার্মেসী খোলা থেকে বন্ধ করার নিয়ম রয়েছে। ড্রাগ লাইসেন্স করার আগে, ঔষধ বিক্রয় ও প্রদর্শনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিককে অবশ্যই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। যদি কেউ ড্রাগ লাইসেন্স ও ফার্মাসিস্ট প্রশিক্ষণ ছাড়াই ঔষধ বিক্রি করে তাহলে ১৯৪২ ও ১৯৪৫ সালের ড্রাগ লাইসেন্স আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিধান রয়েছে। কিন্তু আশুলিয়া ও সাভার উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার এবং অলিগলিতে ঔষধের দোকানে তা মানা হচ্ছে না। যার জন্য অশিক্ষিত, প্রশিক্ষণহীন, ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন ঔষধের দোকান দিন-দিন বেড়েই চলেছে।

তবে সচেতন মহল মনে করেন, ঔষধের মানহীনের পাশাপাশি লাগামহীন দাম হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। সংসারে আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অর্থ উৎস ঔষধের পেছনে চলে যাচ্ছে। ভেজাল ও মানহীন ঔষধের দৌড়ত্মে মানুষের জীবন আশংকার মধ্যে পড়েছে। মানুষের জীবন যেমন সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে তেমনি আর্থিক ক্ষতি ও হচ্ছে। যদি জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে থাকে তবে নকল ও ভেজাল ওষুধ নিয়ন্ত্রণ করা এখনই জরুরি। মেয়াদোত্তীর্ণ, মানহীন-ভেজাল ঔষুধ যারাই উৎপাদন বা বিক্রি করুক তাদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

এদিকে এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ রাসেল জানান, ঔষধ ফার্মেসীতে ড্রাগ লাইসেন্স এর বিষয়টা দেখার দায়িত্ব আমার আছে। ফার্মেসীতে অবৈধ, মেয়াদোত্তীর্ণ ভেজাল ঔষুধ ও নি¤œমানের ঔষধ বিক্রী আইনত অপরাধ। কয়েকদিনের ভেতর লাইসেন্সবিহীনদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।