এবার সরকারি ব্যাংকের ‘অলস’ অর্থ চায় বিএবি

স্টাফ রিপোর্টার : সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কথা বলে সরকারের কাছ থেকে এ পর্যন্ত চার ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা ঋণের সুদহার কমাননি। এবার তারা সরকারি ব্যাংকগুলো থেকেও বাড়তি সুবিধা নিতে চাচ্ছেন। বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নতুন আবদার, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ‘অলস’ পড়ে থাকা অর্থ বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করতে দিলে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বিএবি চাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ‘অলস’ অর্থ (বিভিন্ন বন্ডে রাখা স্বল্প সুদের বিনিয়োগ) নিজেদের ব্যাংকে নিতে। বর্তমানে সরকারি ব্যাংক যে সুদে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়, তাতে সন্তুষ্ট নয় বিএবি। তারা চাচ্ছেন, বন্ডের মতো ওই স্বল্প সুদেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেসরকারি ব্যাংককে অর্থ দিক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়কে দিয়ে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করানোরও চেষ্টা করছে বিএবি।

এ প্রসঙ্গে বিএবি সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার  বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ পড়ে রয়েছে। সেই টাকা বেসরকারি ব্যাংক ব্যবহার করতে পারলে সুদের হার দ্রুত কমে আসবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অর্থ আমরা কীভাবে নেবো, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা করতে হবে। এজন্য আমরা অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েছি।’ সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিএবির নেতারা জরুরি বৈঠক করেছেন। সেখানে ব্যাংকের মালিকরা জানিয়েছেন, আমানতে সুদহার বেশি থাকার কারণে ঋণে সুদহার কমছে না। তহবিল সংকটে পড়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে।

অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তাদের সংগৃহীত আমানতের মাত্র ৫৪ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে। বিধি অনুযায়ী ১৯ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হাতে ২৭ শতাংশ আমানত অলস পড়ে আছে। যেগুলো ৬ শতাংশ সুদে সরকারের বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ রয়েছে। এই অলস অর্থ বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ১১ শতাংশের কমে দিচ্ছে না রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।

বিএবির বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি ব্যাংকের অলস অর্থ ৬ শতাংশ সুদে বেসরকারি ব্যাংক যাতে পেতে পারে, সে ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে আলোচনা করে একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে। অচিরেই বিষয়টি নিয়ে বিএবির নেতারা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন।  সম্প্রতি সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কথা বলে চার ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা। বিএবির চাহিদা অনুযায়ী সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা; সিআরআর ১ শতাংশ হ্রাস; ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। তারপরও ঋণের সুদহার বাড়ছে এবং তা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এত সুবিধা পাওয়ার পরও ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, তারল্য সংকটের কারণে তারা ঋণে সুদের হার কমাতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির চেয়ে মার্চে সুদের হার বেড়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা বলছেন, চলমান পরিস্থিতিতে সুদহার এক অঙ্কে আনতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অলস অর্থ অল্প সুদে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি, বেসরকারি বা বিদেশি সব খাতের ব্যাংকই ঋণের সুদ বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্চ মাসে ৪৪টি ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়িয়েছে। দেশের ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে সবক’টিতেই এখন দুই অঙ্কের সুদ গুনছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে শিল্পঋণ পেতে ব্যবসায়ীদের ২২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘দুই অংকের সুদে আমানত নিয়ে কোনও ব্যাংকই এক অঙ্কের সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে না।’ তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে কলমানি রেট কমলেও আমানতে সুদ হার কমাতে কোনও প্রভাব ফেলেনি। এ কারণে ঋণে সুদহারও কমছে না। গত ১৬ মে এনসিসি ব্যাংকের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. নূরুন নেওয়াজ সেলিম বলেন, ‘আমানতের বেশি সুদ থাকার কারণে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুদহার একক অঙ্কে নামানো সম্ভব হচ্ছে না। আমানতে সুদ হার কমাতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হাতে পড়ে থাকা অলস অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে নিতে চাচ্ছি।’