ইচ্ছেমতো দামে মাংস বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা

স্টাফ রিপোর্টার : রমজান উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে মাংসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু রমজানের প্রথম দিন সিটি করপোরেশন নির্ধারিত দামে কোথাও মাংস পাওয়া যায়নি। বিক্রেতারা তাদের ইচ্ছেমতো দামেই মাংস বিক্রি করছেন। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। উত্তর সিটি করপোরেশন এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনও বৈঠকই করেনি। তবে সংস্থাটি বলছে ডিএসসিসি নির্ধারিত দাম তাদের এলাকাতেও বলবৎ থাকবে। গত সোমবার নগর ভবনে মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মাংসের দাম নির্ধারণ করে দেন। সে অনুযায়ী প্রতিকেজি দেশি গরুর মাংসের দাম ৪৫০ টাকা। বিদেশি বা বোল্ডার জাতীয় গরুর ও মহিষের মাংসের দাম ৪২০ টাকা। ছাগলের মাংসের দাম ৬০০ টাকা ও খাসির মাংস ৭২০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় সিটি করপোরেশন নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে মাংস বিক্রি হচ্ছে।

শুক্রবার (১৮ মে) প্রথম রোজার সকালে দক্ষিণ বনশ্রীর কাজিবাড়ি এলাকায় মাংস বিক্রি হয় ৫০০ টাকা দরে। সিটি করপোরেশন নির্ধারিত দাম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গরুর দাম বেশি। ওই দামে বিক্রি করলে লস হবে।’

সিটি করপোরেশন থেকে নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও বেশি দামে মাংস বিক্রি করার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজাহানপুরের ব্যবসারী রফিক মোল্লা বলেন, ‘সিটি করপোরেশন যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া, তাদের কোনও নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি। ৪৮০ টাকার নিচে আমরা মাংস বিক্রি করতে পারবো না।’

একই অবস্থা দেখা গেছে, খিলগাঁও এলাকার তিলপাড়া এলাকায়। ওই এলাকায় মাংস বিক্রি হয়েছে ৪৮০ টাকা দরে। মেরাদিয়া, দক্ষিণ বনশ্রী, রামপুরা, খিলগাঁও, মালিবাগ, শান্তিনগর, নাজিরাবাজার, ইংলিশ রোড ও গুলশান বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ীদের অনেক বেশি দামে মাংস বিক্রি করতে দেখা গেছে। মাংসের দামের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মেরাদিয়ার বাসিন্দা মাসুমা আক্তার বলেন, ‘মেয়র বা সিটি করপোরেশনের কথা তো কোনও ব্যবসায়ীই মানছে না। যদি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে পারে তাহলে মিডিয়ায় দাম নির্ধারণের ঘোষণা দেওয়ার দরকার কী ছিল? মেয়রের উচিৎ মাংসের দাম নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।’ এ অবস্থায় সিটি করপোরেশন কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের মনিটরিং টিম কাজ করছে। তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। ব্যবসায়ীরা না মানলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, সিটি করপোরেশন যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা যৌক্তিক নয়। করপোরেশন দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে না, এই দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। এই দামের সঙ্গে বাস্তবতার কোনও মিল নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শেখ সালাহউদ্দীন বলেন, ‘বাজারে আমাদের মনিটরিং টিম কাজ করছে। সেভাবে কেউ অভিযোগ করছে না। আমরা যখন দোকানে যাই তখন দেখি নির্ধারিত দামেই বিক্রি হচ্ছে। চলে আসলে চিত্র উল্টো হয়ে যায়। আজ আমাদের টিম মাঠে নেমেছে। কাল থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী এক দুই দিনের মধ্যে নির্ধারিত দামেই মাংস বিক্রি করতে হবে।’ ব্যবসায়ীরা বাড়তি লাভের জন্য বেশি দাম নেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। আর মাংস ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বলছেন, তারা চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে নির্ধারিত দামে মাংস বিক্রি করার। কিন্তু তারা এখনও কোনও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না। কারণ, গাবতলীর গরুর হাটের পাশে থাকা তাদের সমিতির অফিসটি এখনও ‘চাঁদাবাজদের’ দখলে রয়েছে। তাছাড়া, গাবতলী হাটের ইজারাদারের চাঁদাবাজি এখনও বন্ধ হয়নি। ইজারাদার সরকার নির্ধারিত খাজনার চেয়ে বেশি আদায় করছেন। জানতে চাইলে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সেদিন (মাংসের দাম নির্ধারণের) আমরা ডিএসসিসি মেয়রের কাছে দাবি করেছিলাম ডিএনসিসির সঙ্গে আলোচনা করে গাবতলী হাটের ইজারাদারের অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ করা হোক। কিন্তু তা আজও করা হয়নি। ইজারাদার অতিরিক্ত খাজনা আদায় করে যাচ্ছে। গাবতলীতে অবস্থিত আমাদের অফিসটিও ইজারাদার দখল করে রেখেছে। এ অবস্থায় আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। যে কারণে নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন করা কঠিন।’ তিনি জানান, গাবতলী হাটে গরু প্রতি ১০০ টাকা, মহিষ প্রতি ১৪০ টাকা ও ছাগল বা ভেড়া প্রতি ৩৫ টাকা খাজনা নির্ধারিত। কিন্তু ইজারাদার আদায় করছে ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তাদের আদায়ের কোনও সীমারেখা নেই। ফলে এই টাকার প্রভাব মাংসের দামের ওপর পড়ে। মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, ‘অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়। বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও জহুরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বিষয়টি চারদিনের মধ্যে ডিএনসিসিকে নিষ্পত্তি করার জন্য আদেশ দেন। কিন্তু প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম কোনও ব্যবস্থা নেননি। অমরা অর্থের অভাবে আদালত অবমাননার মামলাও করতে পারছি না।’ অতিরিক্ত দামে মাংস বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যদি গাবতলী হাটের ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাহলে নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে মাংস বিক্রি করতে পারব। উভয় সিটি করপোরেশন ঐক্যবদ্ধভাবে মাংসের মূল্য নির্ধারণ না করায় এই সমস্যা হয়েছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিজ উদ্যোগে আমাদের সঙ্গে বসলেও উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চেষ্টা করেও আমরা দাম নির্ধারণ বিষয়ে বসতে পারিনি।’ ব্যবসায়ী সমিতির এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আদালতকে জাবাব দিয়ে দিয়েছি। কারও অভিযোগ থাকলে তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।’ আর ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসূফ আলী সরদার বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে ৩৪টি আইটেমের যৌক্তিক তালিকা আমাদের কাছে মেইল করা হয়। আমরা এগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করে আমাদের ২৯টি কাঁচাবাজার ও মার্কেটে পণ্যের তালিকা যুক্ত করে দিই। তাছাড়া বর্তমানে বাজার দাম মনিটরিং করার জন্য ডিএসসিসির প্রতিটি অঞ্চলে একটি করে মনিটরিং টিম রয়েছে। তারা মাংসের দামসহ অন্যান্য বিষয় মনিটরিং করছে।’