কেসিসি নির্বাচন: তালুকদার খালেক যে কারণে বিজয়ী

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক কয়েকটি  কারণে ভোটযুদ্ধে বিএনপি প্রার্থী মন্জুরের চাইতে এগিয়ে ছিলেন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই। খুলনা নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকের সঙ্গে কথা বলে এমনটি জানা গেছে। প্রার্থীর ২০০৮-১৩ সাল পর্যন্ত মেয়র থাকাকালীন দাফতরিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের জমজমাট প্রচারণা, দল ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সম্ভাব্য উন্নয়ন, নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয়, প্রার্থীর পক্ষে স্থানীয় ভোট, দলের বাইরে অন্তত অর্ধ ডজন প্রভাবশালী কাউন্সিলরের গোপনে ও প্রকাশ্যে সমর্থন ইত্যাদির কারণে এবার তালুকদার খালেক বিএনপি প্রার্থীকে সহজেই পরাজিত করতে সমর্থ হয়েছেন।

জানা গেছে, গত কয়েক বছরে বিএনপি থেকে মেয়র হওয়ায় খুলনা ছিলো উন্নয়ন বঞ্চিত। খুলনার সাধারণ মানুষের মধ্যে আমুল ধারণা, ক্ষমতাসীন দল থেকে মেয়র থাকলে নগরীতে ব্যাপক উন্নয়ন হতো। অন্যদিকে, মেয়র থাকাকালীন সারা শহরে খালেকের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরেজমিনে পরিদর্শনের স্মৃতি আজও ভাসমান। ঠিকাদারের কাছ থেকে রীতিমতো কাজ বুঝে নেয়ার নানা ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছে আজও আলোচনার খোরাক হয়ে আছে।

ব্যক্তি হিসেবে খালেকের তৎকালীন সততা, ইমেজ নগর জুড়ে বিদ্যমান। সূত্রমতে, সমগ্র মহানগরীতেই ক্ষমতাসীন দল আজও এক এবং ঐক্যবদ্ধ। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের জেলা ও নগর নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা মেনে খুলনা আওয়ামী লীগ সকল গ্রুপিং উপেক্ষা করে একযোগে কাজ করছে। নেত্রীর পক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ হেলাল এমপি সার্বক্ষণিক নির্বাচনী কার্যক্রম মনিটরিং করছেন। শেখ হেলালের দুই ভাই শেখ জুয়েল এবং শেখ সোহেলও মেয়র প্রার্থী খালেকের পক্ষে সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। বিশেষ করে শেখ সোহেলের গণসংযোগ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নগরবাসীরও দৃষ্টি কেড়েছে।

এছাড়া দলের কেন্দ্রীয় নেতা এস এম কামাল হোসেন প্রায় এক মাস ধরে খুলনাতে অবস্থান করে একজন কর্মীর মতো সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। শতাধিক সাবেক ভিপি, জিএস,৭০, ৮০ ও ৯০ দশকের সাবেক ছাত্রনেতারা খালেককে জেতাতে দেশের নানান জায়গা থেকে ছুটে এসে কাজ করছেন। দলের সিনিয়র নেতা শেখ হারুন, মোস্তফা রশিদী সুজা এমপি, মন্নুজান সুফিয়ান এমপি, সাবেক মেয়র কাজী আমীন, সদর আসনের এমপি আলহাজ্জ মিজানুর রহমান মিজান, যার যার অবস্থান থেকে কাজ করছেন। বিএনপির দলীয় কোন্দলের বিপরীতে আওয়ামী লীগের ইস্পাত কঠিন ঐক্য দারুণ ফল দিয়েছে বলেই মনে করছেন খুলনার জনগণ। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত তিন দশকে নবীন প্রবীণের সমন্বয়ে খুলনা আওয়ামী লীগের এমন ঐক্যবদ্ধ থাকার অবস্থান নজিরবিহীন।

অন্যদিকে, খুলনার স্থানীয় অওয়ামী লীগের স্বচ্ছল অধিকাংশ নেতা কর্মীই আর্থিকভাবে নির্বাচনে খালেককে সহযোগীতা করেছেন স্বতঃস্ফুর্তভাবে। যার কারণে, নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে আওয়ামী লীগের কোনও আর্থিক সংকট ছিল না।  এর বিপরীতে বিএনপি প্রার্থীর ক্ষেত্রে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।  তারপরে নতুন করে যোগ হয়েছে, দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্দুস সালাম মুর্শিদীর দলে সক্রিয় হওয়া। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই খুলনার জনসভায় তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, খুলনার ৬ টি নির্বাচনী আসনেই দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে আর্থিক সহযোগিতা করবেন এবং করেছেনও তাই।

এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী খালেক বৃহত্তর খুলনার সন্তান। প্রতিপক্ষ বিএনপি দলীয় প্রার্থী মাদারীপুরের সন্তান। ফলে খুলনার আঞ্চলিক অধিকাংশ ভোট এবার খালেকের পক্ষেই ছিল। এমন ধারণা নগরবাসীর। বিশেষ করে, কাজীবাড়ি, হাজীবাড়ি, গাজীবাড়ি, খালাসি বাড়ি, বিশ্বাস বাড়ি, বন্দ পরিবার, মোড়ল পরিবার ও অন্য স্থানীয় পরিবারের হর্তাকর্তারা প্রকাশ্যেই তালুকদার খালেকের পক্ষে নেমে কাজ করছেন।

তালুকদার খালেকের বিজয়ের প্রসঙ্গ টানতে গিয়ে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বাবুল রানা জানান, সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন এবং শেখ হাসিনা আজ একসূত্রে গাঁথা। ফলে, আমাদের প্রাণপ্রিয় সিটির উন্নয়নে খালেকের বিজয়ের কোনও বিকল্প ছিলনা। এর আগে দীর্ঘ সময়ে বিএনপি সরকারও মেয়রে ছিল। কিন্তু খুলনার জন্য তারা কিছুই করেননি। উপরন্ত খুলনার বাজেট কেটে নিয়ে গেছেন বগুড়ায়। এটা খুলনাবাসী জানে। এছাড়া ঢাকা থেকে মাওয়া দিয়ে খুলনা আসার পথে অওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আজ দৃশ্যমান। চলমান উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগের কোনও বিকল্প নেই।