খুলনা নির্বাচনে কাউন্সিলর পদের বিপরীতে ২২ হাজার ভোট বেশি পড়েছে

কেসিসি নির্বাচনে বিভিন্ন পদে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ এসেছে মেয়র পদে পরিমাণ ভোট পড়েছে তার চেয়েও প্রায় সাড়ে ২২ হাজার বেশি ভোট পড়েছে সাধারণ কাউন্সিলর পদের জন্য।

নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী বলছেন, একজন ভোটারের তিনটি করে ভোট দেওয়ার কথা এবং তিনটি ভোটই সমান থাকার বিধান রয়েছে।

অথচ পরিসংখ্যান বলছে, মেয়র পদে ভোট প্রদানের হার ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ, কাউন্সিলর পদে ৬৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে এই হার ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ।

এদিকে জানা গেছে, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। দেখা গেছে, মেয়র পদের প্রার্থীদের জন্য যে পরিমাণ ভোট পড়েছে তার চেয়েও প্রায় সাড়ে ২২ হাজার বেশি ভোট পড়েছে সাধারণ কাউন্সিলর পদের বিপরীতে।

রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলীর সই করা মেয়র পদে বেসরকারি প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, এই নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা তিন লাখ ছয় হাজার ৬৩৬। মোট ভোট প্রদানের হার ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ।

অন্যদিকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল কবির, মো. মাহফুজুর রহমান, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, মো. ওয়ালিউল্লাহ, মো. বজলুল রশিদ, কল্লোল বিশ্বাস, এম মাজাহারুল ইসলাম, মো. হুমায়ুন কবীর, মো. আনিসুর রহমান ও এ টি এম শামীম মাহমুদের সই করা ফলাফল অনুযায়ী ৩১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে মোট ভোট পড়েছে তিন লাখ ২৯ হাজার ৯১টি। যা মেয়র পদে গণনা হওয়া মোট ভোটের চেয়ে ২২ হাজার ৪৫৫টি বেশি। এ ক্ষেত্রে ভোট প্রদানের হার ৬৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

ফলে মেয়র পদের চেয়ে কাউন্সিলর পদে এই সাড়ে ২২ হাজার ভোট কীভাবে বেশি পড়ল তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে মো. ইউনুচ আলী বলেন, ভোটকেন্দ্রের সব দায়-দায়িত্ব প্রিজাইডিং অফিসারের। তারা যে তালিকা পাঠিয়েছেন সেগুলো তারাই হিসাব করে পাঠিয়েছেন।

একই ভাবে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল কবির, মো. মাহফুজুর রহমান, মো. বজলুলর রশিদ, কল্লোল বিশ্বাস, মো. ওয়ালিউল্লাহ, এম মাজহারুল ইসলাম, মো. হুমায়ুন কবীর, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, খলিলুর রহমান ও এ টি এম শামীম মাহমুদ স্বাক্ষরিত ১০টি সংরিক্ষত ওয়ার্ডের ফলাফল তালিকায় দেখা গেছে, সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদের জন্য মোট প্রদত্ত ভোটের যোগফল তিন লাখ পাঁচ হাজার ৬৩৫। ভোট প্রদানের হার ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা সাধারণ কাউন্সিলর ও মেয়র পদে প্রদত্ত ভোটের চেয়ে কম।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া ফলাফলে দেখা যায়, খুলনা সিটি করপোরেশনের ৭৩ নম্বর নয়াবাটি হাজি শরীয়ত উল্লাহ বিদ্যাপীঠ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট ভোটার এক হাজার ৮১৭ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন এক হাজার ৮১৬ জন। অর্থাৎ মাত্র একজন ভোটার ভোট দেননি। ভোটদানের হার ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর মধ্যে মেয়র পদে নৌকা প্রতীক পেয়েছে এক হাজার ১১৪ ভোট, ধানের শীষ পেয়েছে ৩৭৩ ভোট, লাঙল তিন ভোট, কাস্তে তিন ভোট ও হাতপাখা প্রতীক ৭৬টি ভোট পেয়েছে। বাতিল হয়েছে ২৪৭টি ভোট।

এই কেন্দ্রটি পড়েছে খালিশপুরের অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরেই এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। এবার নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী যুবলীগ নেতা তালাত হোসেন কাউট। জানা গেছে, এই কেন্দ্রের সব ভোটারই নারী। কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের জন্য বুথ ছিল তিনটি। সেই হিসাবে একজন ভোটারের ভোট দিতে যদি তিন থেকে চার মিনিট করেও সময় ব্যয় হয় তাহলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এত ভোটারের ভোট দেওয়া সম্ভব নয়।

১০ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও এবারের নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী ফারুখ হিল্টন অভিযোগ করেন, এই কেন্দ্রের মৃত ভোটারদের ভোটও দেওয়া হয়েছে। এই কেন্দ্রের ব্যালট পেপারের মুড়ি বইতে কোনো ভোটারের সই বা টিপসইও নেই। একইভাবে ব্যালট পেপারের পেছনে যে গোল সিল প্রয়োজন হয় তাও নেই। তিনি এসব অভিযোগ ভোটগ্রহণের দিন লিখিত আকারে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও দায়িত্বরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। তাঁরা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অভিযোগ জানাতে বলেন। আবার রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ভোটকেন্দ্রের দায়িত্ব প্রিজাইডিং কর্মকর্তার, তিনিই সব করতে পারেন।

একই ধরনের চিত্র ছিল ৭৪ নম্বর মাওলানা ভাষানী বিদ্যাপীঠ স্কুল ভবনের দ্বিতীয় তলার পুরুষ ভোট কেন্দ্রে। এখানে এক হাজার ৫০৩ ভোটের মধ্যে এক হাজার ৪৬৭টি ভোট পড়েছে। যার হার ৯৭ দশমিক ৬০ শতাংশ।

এসব চিত্র দেখিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষরযুক্ত শিট তাদের কাছে এসেছে, ওর ভিত্তিতেই তারা ফলাফল করেছেন। প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে বার বার বলে দেওয়া হয়েছে একজন ভোটার তিনটি ভোট দেবে এবং তিনটি ব্যালট পেপার বাক্সে ফেলবে। ব্যালট পেপারের মুড়ি বইতে ভোটারের সই বা টিপসই থাকতে হবে। একইভাবে ব্যালট পেপার দেওয়ার আগে গোল সিল মারতে হবে।

তবে একটি কেন্দ্রে ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট দেওয়া সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এই কর্মকর্তা।