গুলশান হামলা মামলা: চার্জশিট দিতে এত সময় লাগছে কেন?

স্টাফ রিপোর্টার : গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনার প্রায় দুই বছর হয়েছে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে, তবে এখনও মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মাস বা জুনের যেকোনও দিন এই চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। গত বছর ডিসেম্বরে চার্জশিট জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন সিটিটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরপর আরও পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও জমা পড়েনি চার্জশিট। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে চার্জশিট দিতে কেন এত বিলম্ব হচ্ছে?

সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, হলি আর্টিজানের হামলার ঘটনাটি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বড় এবং ভয়াবহ একটি ঘটনা। এ কারণে চার্জশিট দেওয়ার আগে প্রতিটি বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও ভুলত্রুটি পর্যালোচনা করে চার্জশিট প্রস্তুত করা হচ্ছে। যাতে আদালতে জমা দেওয়ার পর চার্জশিটের কোনও ভুলের কারণে অপরাধীদের কেউ কোনও বিশেষ সুবিধা না পায়। এজন্য দিনের পর দিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিখুঁতভাবে চার্জশিট তৈরি করা হচ্ছে।

সিটিটিসি’র উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা চার্জশিট প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছি। এখন শেষ মুহূর্তের পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেহেতু এটি একটি বড় ঘটনা, তাই আমরা সময় নিয়ে নির্ভুলভাবে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

তদন্ত তদারকের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা বলেন, ‘চার্জশিট অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে সাগর নামে পলাতক একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খুব শিগগিরই আমরা আদালতে এই মামলার চার্জশিট দিয়ে দেবো।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এরই মধ্যে তারা গুলশান মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন। গুলশান হামলায় বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে যে পাঁচ হামলায় সরাসরি অংশ নিয়ে মারা গিয়েছিল তারাও রয়েছে। রোহান ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, শফিকুল ইসলাম উজ্জল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল নামে এই পাঁচ জঙ্গি সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এ নিহত হয়।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে সিটিটিসি’র পৃথক অভিযানে ৭ জন ও র‌্যাবের একটি অভিযানে মারা যাওয়া একজনও এই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে সিটিটিসি’র তদন্তে উঠে এসেছে। যার মধ্যে ভয়াবহ এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বাংলাদেশি বংশাদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরীও রয়েছে। ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে এক অভিযানে দুই সহযোগীসহ মারা যায় তামিম চৌধুরী, যাকে ধরিয়ে দিতে পারলে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ পুলিশ।

সূত্র জানায়, গুলশান হামলায় জড়িতদের মধ্যে অন্য যারা বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল তারা হলো সরোয়ার জাহান মানিক, তানভীর কাদেরী, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলাম, নূরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান চকলেট, মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান এবং আবু রায়হান তারেক। এদের মধ্যে ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই কল্যাণপুর অভিযানে আবু রায়হান তারেক, ২ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রূপনগরের অভিযানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলাম, ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের অভিযানে তানভীর কাদেরী, ৮ অক্টোবর আশুলিয়ার অভিযানে সরোয়ার জাহান মানিক ওরফে আব্দুর রহমান এবং গত বছরের ৫ জানুয়ারি মোহাম্মদপুরে সিটিটিসির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নূরুল ইসলাম মারজান এবং ২৬ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের অভিযানে বাশারুজ্জামান চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান মারা যায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গুলশান হামলায় জড়িত যারা বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছে তাদের মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও হামলায় তাদের কার কি ভূমিকা ছিল তা উল্লেখ থাকবে। চার্জশিটের উল্লেখ করা অভিযোগ থেকে জানা গেছে, সরোয়ার জাহানকে পরিকল্পনায় সহায়তা, তানভীর কাদেরীর বিরুদ্ধে হামলাকারীদের আশ্রয় দেওয়া, জাহিদুল ইসলাম ও তারেকের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ, মারজানের বিরুদ্ধে পরিকল্পনায় সহায়তা ও রেকি করা, বাশারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অর্থসহযোগিতা, মিজানের বিরুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ উল্লেখ থাকবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, হোলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে। যদিও সর্বশেষ হাদীসুর রহমান সাগরসহ মোট ৭ জনকে এই মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, হামলার সেই রাতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে জঙ্গিদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকা হাসনাত রেজা করিমের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ না পাওয়ায় তাকে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে। অভিযোগপত্রে নাম উল্লেখ করা আসামিদের মধ্যে রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, আসলামুল ইসলাম ওরফে রাশেদ ওরফে র‌্যাশ ও মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান ও হাদীসুর রহমান সাগরের নাম থাকছে। গ্রেফতার হওয়া জীবিত আসামিদের মধ্যে রিগ্যানের বিরুদ্ধে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ, রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে পরিকল্পনা ও হামলাকারী সরবরাহ, রাশেদ ওরফে র‌্যাশের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা ও রেকি এবং সোহেল মাহফুজ ও বড় মিজানের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা, অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহের অভিযোগ আনা হবে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সর্বশেষ গ্রেফতার হওয়া সাগরসহ গ্রেফতারকৃত ছয়জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হলি আর্টিজানে হামলার প্রাথমিক পর্যায়পরিকল্পনাকারী হিসেবে আরও দুজনের নাম এসেছে। তারা হলো মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ। তবে তারা হামলার পরপরই পার্শ্ববর্তী একটি দেশে পালিয়ে যায়। তাদের পলাতক দেখিয়ে চার্জশিট দেওয়া হবে। প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের কূটনৈতিকপাড়ায় হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশি নাগরিক, দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২২ জন নিহত হয়। এ ঘটনায় গুলশান থানা পুলিশ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করে।