কোটা কী, আন্দোলন কেন?

স্টাফ রিপোর্টার : পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে সারা দুনিয়ায় কোটা সংরক্ষণ করা হয়। সমতার ভিত্তিতে কোনও দেশকে উন্নত করতে কোটা জরুরি। বাংলাদেশেও এই ব্যবস্থা থাকা স্বাভাবিক। তাহলে কোটা নিয়ে এতো বিতর্ক কেন, কেন আন্দোলন? সংশ্লিষ্টদের মতে, কোটা নিয়ে বিতর্ক থাকার কোনও কারণ নেই। কিন্তু কোন ক্ষেত্রে কারা কতটুকু পিছিয়ে রয়েছে, কত শতাংশ কোটা রাখা প্রয়োজন, তার কোনও হিসাব নেই সরকারের কাছে। সে কারণেই সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। শুধু যথাযথ সংস্কার না হওয়াতেই যত বিপত্তি দেখা দিয়েছে। কোটা সংস্কারে বিগত সব সরকারের দায়িত্বহীনতার কারণেই বারবার আন্দোলন হচ্ছে। কোটা নিয়ে বিতর্ক ও আন্দোলন প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান বলেন, ‘কোটা কখনোই পার্মানেন্ট নয়। দেশে কোটা সংস্কার হয় না। চার-পাঁচ বছর পর পর কোটা সংস্কার হওয়া দরকার। কয়েক বছর পর পর দেখতে হয় কোটা কতটা কার্যকর আছে। কোটা সব সময় পঞ্চাশ শতাংশের নিচে থাকতে হবে। ৫০ শতাংশের বেশি সংবিধানসম্মত নয়। এসব কারণেই আন্দোলন হচ্ছে। আর আন্দোলনও যৌক্তিক।’ আকবর আলী খান আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, সব মুক্তিযোদ্ধা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে না। তাই সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধার জন্য কোটা প্রয়োজন নেই। এটা থাকলে মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মুক্তিযোদ্ধা সেজে সুবিধা নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলবে। তবে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা রাখতে হবে।’ কোটা সংস্কার না করার কারণেই বারবার দাবি উঠেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য  অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘কোটা সংস্কারে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কার জন্য কত শতাংশ কোটা প্রয়োজন, তা পরিসংখ্যানসহ বণ্টন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তা না হলে বারবার আন্দোলন হতে পারে।’

জানা যায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ১৯৭২ সালে উপহার হিসেবে কোটা চালু করেছিলেন। যদিও এই উপহারকে সরাসরি কোটা বলার সুযোগ কম। ওই সময় সরকারি কর্মচারী নিয়োগে মাত্র ২০ শতাংশ নেওয়া হয়েছিল মেধায় (সাধারণ), ৪০ শতাংশ জেলা কোটা আর ১০ শতাংশ ছিল নারী কোটা। আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার হিসেবে কোটা সংরক্ষণ করা ছিল ৩০ শতাংশ।

১৯৭৬ সালে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ জেলা কোটা থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে সাধারণদের জন্য ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হয়, মুক্তিযোদ্ধা কোটার ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের সমান ৩০ শতাংশ কোটা রাখা হয়। নারীদের জন্য ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষিত থেকে যায়। আন্দোলনকারী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনও ধরনের পরিসংখ্যান ছাড়াই ১৯৭৬ সালের পর আবারও ১৯৮৫ সালে কোটা সংস্কার করা হয়। ওই বছর কোটা সংস্কার করে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে পাঁচ শতাংশ বাড়িয়ে সাধারণদের জন্য ৪৫ শতাংশ নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা আগের মতোই ৩০ শতাংশ রাখা হয়। এছাড়া জেলা কোটা ১০ শতাংশ ও নারীদের জন্য ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করা হয় আগের মতোই। আর প্রথমবারের মতো উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পাঁচ শতাংশ কোটা রাখা হয়।

কিন্তু কোনও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কোটা ব্যবস্থার এ বিভাজন হয়নি। শুধু তাই নয়, কোটায় প্রার্থী না থাকলেও কোটার বাইরে শূন্যপদে কাউকে নিয়োগ দেওয়াও হয়নি। উল্টো অবৈধ সুযোগ নিয়ে অমুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি দেওয়ার অভিযোগও এসেছে অনেকবার।

পরে, ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য নতুনভাবে কোটা ব্যবস্থা চালু করেন। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর জেলাওয়ারি কোটা নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে দেশের সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার ছেলে ও মেয়ে, নাতি-নাতনি কোটা, জেলা কোটা, উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা, পোষ্য কোটা, নারী কোটাসহ বিভিন্ন কোটা বিদ্যমান।

বর্তমানে সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটার বিন্যাস হচ্ছে- মুক্তিযোদ্ধা ৩০ শতাংশ (ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি), নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ। এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে ১ শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী নিয়োগের বিধান রয়েছে। এর বাইরে বাকি ৪৫ শতাংশ সাধারণদের জন্য বরাদ্দ।

সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, বিভিন্ন করপোরেশন ও দফতরে সরাসরি নিয়োগে জেলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে জেলা কোটা পুনঃনির্ধারণ করা হয়। ২০০১ সালের আদমশুমারির পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর জেলাওয়ারি কোটা ঠিক করে সরকার।

২০১০ সালের ৫ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত পরিপত্রে বলা হয়, জেলা কোটার (১০ শতাংশ) সব পদ জেলার প্রার্থীদের দিয়ে পূরণ সম্ভব না হলে জেলা কোটা জাতীয় মেধা তালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। বিভিন্ন জেলার জন্য বরাদ্দ কোটায় যোগ্য প্রার্থী বিবেচিত না হলে, নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বিশেষ কোটার প্রার্থীদের দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও উপজাতীয়দের জন্য জাতীয় মেধা তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এরপর বিশেষ কোটার অধীন স্ব-স্ব কোটার প্রার্থীদের তালিকা থেকে তা পূরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এক্ষেত্রে জেলার কোটাও চলে যাচ্ছে অন্য কোটায়, ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে দুর্নীতির। এসব কারণেই কোটার বিরুদ্ধে বারবার আন্দোলন হতে দেখা গেছে।