৮৬ ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটে দাম বাড়ে রমজানে!

আর মাত্র কয়েকদিন পরই শুরু রমজান। এবার রমজানকে সামনে রেখে রেকর্ড পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এমন অবস্থার পরেও দাম বেড়েছে পেঁয়াজ, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছোলা, চিনি, পেঁয়াজ, ডাল, খেজুর ও ভোজ্যতেলে এখন ভর্তি আছে ৮৬ ব্যবসায়ীর গুদাম। একচেটিয়া ব্যবসা করতে প্রথমে সর্বোচ্চ পণ্য আমদানি করেছে এ সিন্ডিকেট। এরপর এসব পণ্য গুদামজাত করে অস্থির করছে বাজার।  রমজানে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে চট্টগ্রামে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। নিজস্ব উদ্যোগে পণ্য বিক্রি করছে ট্রেডিং করপোরেশন বাংলাদেশ (টিসিবি)। তার পরও কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় আগামীকাল রোববার ঢাকায় ব্যবসায়ীদের বৈঠক ডেকেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। কারা দাম বাড়াচ্ছেন তা খতিয়ে দেখারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। রমজানকে সামনে রেখে বিপুল পণ্য আমদানির কথা স্বীকার করেছেন সংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ীরাও। শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, রমজানকে সামনে রেখে এবার প্রচুর পণ্য আমদানি করা হয়েছে। ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এবং পরিবহনে বাড়তি খরচ ও সময় যুক্ত না হলে এবার গতবারের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর গুটিকয়েক ব্যবসায়ীই কারসাজি করছেন রমজানের বাজার নিয়ে। কেউ সরবরাহ কমিয়ে, কেউ কারখানায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখিয়ে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। অথচ গত ১ এপ্রিল বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ব্যবসায়ীরা রমজানে পণ্য সরবরাহ ঠিক রেখে দাম না বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন।  স্থানীয় বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা, চিনির দাম কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা ও রসুনের দাম কেজিতে ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। বাড়তে শুরু করেছে ভোজ্যতেলের দামও। চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, ‘রমজানের পণ্য নিয়ে কেউ যাতে একচেটিয়া ব্যবসা করতে না পারে সেজন্য বাজার তদারকি করতে ভ্রাম্যমাণ টিম গঠন করেছি আমরা। কার তাছে কী পণ্য আছে সংগ্রহ করেছি সেই তথ্যও।’  জানা গেছে, ২০১৮ সালের প্রথম চার মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে শীর্ষ পাঁচ পেঁয়াজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একে ট্রেডিং ৭৬ লাখ টাকায় ২৬৬ টন, সুরমা টেক্স ২৫ লাখ টাকায় ৮৭ টন, মক্কা এন্টারপ্রাইজ ১৪ লাখ টাকায় ৮৪ টন, জেনি এন্টারপ্রাইজ ১৬ লাখ টাকায় ৫৮ টন ও এনএন এন্টারপ্রাইজ ১৮ লাখ টাকায় ৫৬ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছে। এই ৫ ব্যবসায়ীর গুদামেই আছে আমদানি করা পেঁয়াজের প্রায় অর্ধেক। রমজানের জন্য চলতি বছরের প্রথম চার মাসে রসুন আমদানি করেছে ৭০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান। তবে এককভাবে ২০০ থেকে ২৫০০ টন পর্যন্ত রসুন আমদানি করেছে ১৮ জন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৭ কোটি টাকায় আড়াই হাজার টন রসুন এনেছে মনজু এন্টারপ্রাইজ। অন্যদের মধ্যে ইমতিয়াজ এন্টারপ্রাইজ সাড়ে সাত কোটি টাকায় এক হাজার ৮৫ টন, ফাহাদ ট্রেডিং ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকায় ৭৫৪ টন, ভাই ভাই ইন্টারন্যাশনাল সাড়ে ৪ কোটি টাকায় ৬৬৭ টন, ওয়াশিফ ট্রেডিং ৪ কোটি টাকায় ৬০৯ টন, নিউ ফাতেমা এন্টারপ্রাইজ ও এনএন এন্টারপ্রাইজ ৪ কোটি টাকায় ৫৮০ টন রসুন আমদানি করেছে। এখানে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের গুদামে আছে আমদানি করা রসুনের বেশিরভাগ। মটর ডাল আমদানি করা ৪০ ব্যবসায়ীর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- রুবি ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেড, অর্পিতা ট্রেডার্স, গাজী ট্রেডিং, পাপড়ি ডাল মিলস, বেঙ্গল ট্রেডিং, লাকি ট্রেডিং, আরএস ইন্টারন্যাশনাল, সালমা ট্রেডিং, এসএন ডাল মিলস ও লাভলী স্টোর। এসব প্রতিষ্ঠান ২৬ কোটি টাকা থেকে ৬২ কোটি টাকায় এক হাজার টন থেকে ৩০ হাজার টন মটর ডাল আমদানি করেছে। আমদানিকৃত মটর ডালের বেশিরভাগ আছে এসব প্রতিষ্ঠানের গুদামে। ছোলা বুট আমদানি করা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে ৭০টিরও বেশি। তবে আমদানিকৃত ছোলা বুটের প্রায় অর্ধেকই এনেছে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বসুন্ধরা ট্রেডিং কোম্পানি ১৩৯ কোটি টাকায় এককভাবে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯১৭ টন ছোলা বুট আমদানি করেছে। ১১৫ কোটি টাকায় সাড়ে ২১ হাজার ৫০০ টন ছোলা বুট আমদানি করে দ্বিতীয় স্থানে আছে সিটি ডাল মিলস লিমিটেড। এরপর পর্যায়ক্রমে আছে সিলভার ডাল অ্যান্ড মিলস লিমিটেড, লাকি ট্রেডিং, ইফাদ মাল্টি প্রোডাক্ট লিমিটেড, এ কে করপোরেশন, হাছান অটোমেটিক ডাল মিলস, সালমা ট্রেডিং, চৌধুরী করপোরেশন ও ট্রেড কোম্পানি। এসব প্রতিষ্ঠান দুই হাজার টন থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯০০ টন পর্যন্ত ছোলা বুট আমদানি করেছে। মসুর ডাল আমদানি করা শীর্ষ সাত আমদানিকারক হচ্ছে রুবি ফুড প্রোডাক্ট, এ কে করপোরেশন লিমিটেড, লাভলী স্টোর, জেসপার ট্রেডিং, বিএন ট্রেডার্স, ট্রেড কোম্পানি ও লাকি ট্রেডিং। এসব প্রতিষ্ঠান দুই হাজার টন থেকে সর্বোচ্চ ১৩ হাজার টন পর্যন্ত মসুর ডাল আমদানি করেছে। এজন্য সাড়ে ৮ কোটি টাকা থেকে শুরু করে কেউ কেউ ব্যয় করেছেন ৪৫ কোটি টাকা পর্যন্ত। প্যাকেট খেজুর আমদানিতে শীর্ষ চার আমদানিকারক হচ্ছে অ্যারাবিয়ান ডেটস ফ্যাক্টরি, রয়েল ফ্রেশ ফুডস, সাপোয়ানা ফুড ট্রেডিং করপোরেশন ও মদিনা ফুডস লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠান এক হাজার টন থেকে শুরু করে ১৮০০ টন পর্যন্ত প্যাকেটজাত খেজুর আমদানি করেছে। ভেজা খেজুর আমদানি করা শীর্ষ ছয় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে অ্যারাবিয়ান ডেটস ফ্যাক্টরি, রয়েল ফ্রেশ ফুডস, রামিসা বিডি লিমিটেড, এডি ফ্রুটস লিমিটেড, আল্লাহর রহমত স্টোর ও হৃদয় এন্টারপ্রাইজ। এক হাজার ৩০০ টন থেকে শুরু করে এসব প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ হাজার টন ভেজা খেজুর আমদানি করেছে। শুকনা খেজুর আমদানি করা শীর্ষ পাঁচ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- সাউদার্ন ট্রেডিং, জেবি অ্যান্ড ব্রাদার্স, সাদিক অ্যান্ড ব্রাদার্স, এডি ফ্রুটস লিমিটেড ও জেসপার ট্রেডিং। ৫০ টন থেকে শুরু করে এসব প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ১৩০ টন শুকনো খেজুর আমদানি করে। আদা আমদানি করা শীর্ষ সাত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ওয়াসিফ ট্রেডিং, ওএস ট্রেডার্স, অপু এন্টারপ্রাইজ, রফিক ট্রেডার্স, খাসিদ ট্রেডিং, ট্রানজিল এন্টারপ্রাইজ ও জেনি এন্টারপ্রাইজ। ৫০০ টন থেকে শুরু করে এসব প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৭৮২ টন পর্যন্ত আদা আমদানি করেছে। আমদানিকৃত চিনির ৯০ শতাংশ মজুদ আছে ৫টি কোম্পানির কাছে। ভোজ্যতেল আমদানি করেছে ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৬টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আমদানি করেছে ৯০ ভাগ ভোজ্যতেল।