পাল্টাপাল্টি অভিযোগে অনিশ্চিত উচ্চ মাধ্যমিকের বই ছাপা

উচ্চ মাধ্যমিকের বই ছাপানো নিয়ে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্ধারণ করে দেয়া কাগজ ও বইয়ের মূল্য কম হওয়ায় বই ছাপাতে অনীহা দেখাচ্ছেন মুদ্রণকারীরা। ফলে নকল বইয়ে বাজার সয়লাব হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন তারা। অন্যদিকে মুদ্রণকারীদের অতি মুনাফার লোভে উচ্চ মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ। বাজার যাচাই-বাছাই করে দর নির্ধারণ করা হলেও কেউ দরপত্র ফেলেনি দাবি প্রতিষ্ঠানটির। এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হতে আর মাত্র দুই মাস সময় থাকলেও এখনও বই ছাপার কাজ শুরুই হয়নি।  জানা গেছে, একাদশ শ্রেণির প্রায় ৩০টি বিষয়ের মধ্যে বাংলা সাহিত্য, বাংলা সহপাঠ (উপন্যাস ও নাটক) এবং ইংরেজি প্রথম পত্র (ইংলিশ ফর টুডে) এ তিনটি বই এনসিটিবি নিজস্ব লেখক দিয়ে প্রস্তুত করে বেসরকারি প্রকাশকদের মাধ্যমে ছাপানো হয়। এর বিনিময়ে এনসিটিবি প্রতি বছর প্রায় পাঁচ কোটি টাকা রয়্যালটি (সম্মানী) পায়। এবার প্রায় ২৪ লাখ বই ছাপার জন্য ২৪টি লটে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। গত ৩ মে দরপত্র খোলা হলে বই ও কাগজের মূল্য কম হওয়ায় ছাপাকারীদের কেউই দরপত্র জমা দেয়নি। ফলে এনসিটিবির কর্মকর্তারা রীতিমতো ‘থ’হয়ে যান। একটি প্রতিষ্ঠানও এতে অংশ না নেয়ায় সমঝোতার মাধ্যমে কাজ দেয়ার চেষ্টা হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তা-ও আটকে যায়। প্রকাশকরা বলছেন, এনসিটিবির দায়িত্বহীনতা এই সংকটের পেছনে দায়ী। তারা জানান, সারাদেশে এসব বইয়ের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাজারে প্রচুর নকল বই বিক্রি হয়। এনসিটিবির ছাপানোর আগেই বাজার নকল বইয়ে সয়লাব হয়ে যায়। গত বছর প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের এক থেকে দেড় লাখ বই বিক্রি হয়নি। তা এখনো গোডাউনে পড়ে আছে। এছাড়া চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের দাম টন প্রতি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা বেড়েছে। কাগজ তৈরির পাল্প, কালিসহ শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। কিন্তু এনসিটিবি গত বছরের দামে এ টেন্ডার আহ্বান করেছে।   এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সাল পর্যন্ত এনসিটিবি নিজেই এসব বই বাজারজাত করত। এতে প্রতি বছর লোকসানের কারণে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে অফারিং পদ্ধতিতে ১৭ জন প্রকাশকের মাধ্যমে বাজারজাত শুরু করে। গত বছর প্রকাশকদের চাপে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ায়। এবার কোনো প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ না নেয়ায় এ বইয়ের ভবিষ্যৎ কী তা এখনও অনিশ্চিত। চলতি বছর তিনটি বই ছাপার জন্য ২৪টি লটে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। প্রতিটি লটে ১ লাখ ২৫ হাজার বই ছাপা হয়। প্রায় ৩০ লাখের বেশি বই ১১৫ টাকা দরে ২৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা খরচ হবে। প্রতি লটের জন্য ১৮-২০ লাখ টাকা রয়্যালটি পায় এনসিটিবি। সে হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি এখান থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা রয়্যালটি পাবে। এ টাকা সরকারের ফান্ডে জমা দেয়া হয় না। বিভিন্ন বোনাস, নানা খাত, উপ-খাত দেখিয়ে এ টাকা ভাগবাটোয়ারা করা হয়।  বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ  বলেন, এনসিটিবি কাগজের দাম ও বইয়ের নির্ধারিত মূল্য কম দেয়ায় আমরা কেউ দরপত্র প্রদান করিনি। এ দরে কাজ করলে আমাদের লোকসান হবে, লোকসানে তো কেউ কাজ করবে না। তিনি বলেন, বাজারে নকল বই বন্ধ করতে লাইব্রেরি মালিকদের কমিশন বেশি দিয়ে আসল বই বিক্রি করতে হয়। বিশ্ব বাজারে কাগজের দাম কমে গেছে। সব খরচ বেড়েছে। এনসিটিবি প্রতিনিয়ত বৈষম্য সৃষ্টি করছে। তারা নিজেরাই ৪০ হাজার টাকা বেশি দামে কাগজ কিনছে, আর আমাদের ক্ষেত্রে আগের বছরের দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে। তারা কারও কারও দ্বারা প্ররোচিত হয়ে বিভিন্ন কাজে বিভিন্ন রেট ঘোষণা করছে। তিনি আরও বলেন, যেসব ছাপাখানার বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের ডেকে কাজ দেয়া হচ্ছে। এনসিটিবি’র এসব দুর্নীতির কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের নকল বইয়ে বাজার সয়লাব হবে। শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে নকল বই কিনে পড়তে হবে বলে জানান মুদ্রণ শিল্প সমিতির এ সভাপতি।  কোনো প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ না নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা  বলেন, আমরা আবার টেন্ডার আহ্বান করব। মুদ্রণকারীরা অতি মুনাফা লাভের জন্য টেন্ডার ফেলেনি। তাদের অতি লোভের কারণে আমাদের বিপাকে পড়তে হয়। চেষ্টা চলছে তাদের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করার। কাগজের দাম ও বইয়ের মূল্য কম হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে চেয়ারম্যান বলেন, বাজার যাচাই করে দর নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে যদি কম হয় তবে তাদের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে কাগজের দাম ও বইয়ের মূল্য নির্ধারণ করা হবে। তারা আমাদের কিছু না জানিয়ে চুপচাপ বসে থাকলে তো সমাধান হবে না। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি, আগামী সপ্তাহের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর কাজ শুরু করার। যদি তা হয় তবে পরবর্তী এক মাসের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ শেষ হয়ে যাবে। তাই বাজারে নকল বই সয়লাব হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি। উল্লেখ্য, আগামী ১৩ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত চলবে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন কার্যক্রম। ৩০ জুন পর্যন্ত চলবে ভর্তি। আগামী ১ জুলাই ক্লাস শুরু হবে।