আমিনবাজারে পিটিয়ে ৬ ছাত্রের হত্যার বিচার ধীরগতিতে চলছে

স্টাফ রিপোর্টার : প্রতি বছর শবে বরাত এলেই ৬ ছাত্রের পরিবারসহ সাভারের আমিনবাজারের কিছু পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। ২০১১ সালের ১৭ জুলাই (শবে বরাতের রাতে) সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামের কেবলাচরে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের তিন শিক্ষার্থীসহ ৬ কলেজছাত্রকে। অথচ মামলাটি সাত বছর চললেও এখনো বিচার শেষ হয়নি। ধীরগতিতে চলছে সাভারের আমিনবাজারে ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার বিচার। প্রায় পাঁচ বছর আগে মামলার অভিযোগ গঠন হয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম ধীরগতিতে পরিচালিত হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, হত্যা মামলার খোঁজ-খবর না নিতে অনবরত প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আসামিপক্ষের হুমকির বিষয়ে থানা-পুলিশকে জানালেও কোনো লাভ হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের। হত্যার বিচার চাওয়ায় প্রাণনাশের হুমকিতে চরম আতঙ্কে ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা। এরূপ পরিস্থিতিতে হত্যার সুবিচার পাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

২০১১ সালের ১৭ জুলাই শবে বরাতের রাতে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রাামের কেবলার চরে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেনÑ ধানম-ির ম্যাপললিফের এ লেভেলের ছাত্র শামস রহিম, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইব্রাহিম খলিল, বাঙলা কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তৌহিদুর রহমান পলাশ, তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র টিপু সুলতান, মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সিতাব জাবীর মুনিব এবং বাঙলা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র কামরুজ্জামান কান্ত। ওই ঘটনায় নিহতদের বন্ধু আল-আমিন গুরুতর আহত হলেও বেঁচে যান। ঘটনার পর ডাকাতির অভিযোগে আল-আমিনসহ নিহতদের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় ডাকাতি মামলা করেন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক। ওই সময় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা গ্রামবাসীকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় আরেকটি মামলা করে।

পুলিশ, সিআইডির হাত ঘুরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তভার র‌্যাবের হাতে দেয়া হয়। তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ উদ্দিন আহমেদ ৬০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামিরা নিরীহ ছাত্রদের হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করে জখম করে। পরবর্তীতে হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে মসজিদের মাইকে সবাইকে ডাকাত আসার ঘোষণা দেয় এবং থানায় মিথ্যা মামলা দায়ের করে। বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দ্বারা আঘাত করে তাদের হত্যা করা হয়। ২০১৩ সালের ৮ জুলাই আদালত ৬০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু করেন। ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একমাত্র ভিকটিম আল আমিনকে একই ঘটনায় করা ডাকাতি মামলা থেকে সেদিন (চার্জ গঠনের সময়) অব্যাহতি দেয়া হয়।

মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, এ হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত মামলার বাদীসহ ৪৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। অপরদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ৩৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ এখনো বাকি রয়েছে। ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর এ মামলার প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি এ মামলায় নিহত ছাত্র শামস রহিম শামীম বাবা আনিসুল হক চন্দন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া ১৩ মার্চ মামলার এজাহার তৈরিকারী এসআই জোবায়দুল হকের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। আগামী ৯ মে এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য রয়েছে। ওইদিন সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৯ জন সাক্ষীর প্রতি ইতিমধ্যেই সমন দেয়া হয়েছে।

নিহত কামরুজ্জামান কান্তর বাবা আবদুল কাদের সুরুজ বলেন, প্রতি বছর শবে বরাত এলেই ছেলের শোকে কাতর হয়ে যান কান্তর মা। সারাক্ষণ কান্না করেন আর আল্লাহর কাছে বিচার চান। আমার ছেলেকে হত্যা করে ডাকাতির মিথ্যা মামলা দিয়েছিল। পবিত্র রাত বলেই আল্লাহর অশেষ রহমতে সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন হয়েছে। সত্য উদ্ঘাটনের পর আমাকে নানা প্রলোভন দেখানো হয়। প্রলোভনে পা না দেয়ায় প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে। এরপর থেকে হুমকি-ধমকি দেয়া অব্যাহত রয়েছে। হুমকি সত্ত্বেও আদালতে গিয়ে এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছি।

নিহত ইব্রাহিম খলিলের মা বিউটি বেগম বলেন, দেশে কত কিছুর বিচার হচ্ছে। আর এমন নৃশংস হত্যাকা-ের বিচার হচ্ছে না। কী নিষ্ঠুরভাবে ছেলেগুলোকে খুন করা হলো। খুনিরা আদালতে ছাত্রদের হত্যার কথা স্বীকারও করেছে। এরপরও সাত বছর পার হয়ে গেল। দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। অনেক কষ্ট পেয়ে আমার ছেলে মারা গেছে। এ যে কী বেদনার আমি তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। অসুখ কিংবা দুর্ঘটনায় মারা গেলেও এত দুঃখ ছিল না। শবে বরাতের রাতে আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া তা হলো খুনিদের বিচার চাই। আদালতে যাই বলে আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। মামলার খোঁজ-খবর নিতে আদালতে গেলে মেরে ফেলবে বলেছে দুর্বৃত্তরা। গত মাসেও টেলিফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। ওই সময় আমিও বলেছি, যাই হোক হবে। জীবন গেলেও আদালতে যাব, সাক্ষী দেবে। জীবনের বিনিময়ে হলেও ছেলে হত্যার বিচার চাইব।

সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর শাকিলা জিয়াছমিন (মিতু) বলেন, এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের কার্যক্রম দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। মামলার বাদী, নিহতদের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার, আসামিদের স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট ও নিহতদের বাবা-মার সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, মামলাটি তিনজন তদন্ত করেছেন। এখন শুধু তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি রয়েছে। আগামী ধার্য দিনে তদন্ত কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ হলেই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শেষ করা হবে। চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে রাষ্ট্রপক্ষের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে এ মামলায় ৯ আসামি পলাতক রয়েছেন। এরা হলেন- সাব্বির, সালাম, আফজাল, মাসুদ, শাহদাত, আমির হোসেন, মোবারক, সাত্তার ও কালাম। আর আসামি রাশেদ মারা গেছেন। এ ছাড়া প্রধান আসামি আবদুল মালেকসহ ৫০ আসামি জামিনে আছেন। এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে ১৪ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।