তারেক রহমান ইস্যুকে এখন কেন গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে হঠাৎ করেই বিতর্ক তোলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।  এর জের ধরে তিনি নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন কিনা, তা নিয়েও রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা চলছে।  দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতৃত্বকে বিতর্কিত করার টার্গেট নিয়ে এমন আলোচনা তুলেছে। তারা এটাও বলছেন যে, তারেক রহমানকে হুমকি মনে করছে আওয়ামী লীগ, যে বক্তব্য অবশ্য হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে সরকারি দল।   তারেক রহমান ব্রিটিশ স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয়ে তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। এ তথ্যের সূত্র ধরেই এ বিতর্কের সূচনা হয়। খবর বিবিসির।  বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘যখন আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে রয়েছেন।একইসাথে যদি তারেক রহমান সাহেবের ব্যাপারে একটা বিতর্ক সৃষ্টি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা যায়।তাহলে তারা মনে করছে যে, তাদের পক্ষে যাবে। কিন্তু এটা আসলে তাদের জন্য বুমেরাং হিসেবে কাজ করেছে। কারণ ব্রিটিশ আইনে সেখানে গিয়ে কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে তার নিজ দেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে হয় না। এটা না বুঝে বিতর্ক তোলা হয়েছে।’  আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, এই দু’টি দলই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে।  নির্বাচনের সময় প্রতিদ্বন্দ্বি এই দুই দলের নেতৃত্বেই অন্যান্য দলগুলো অবস্থান নেয় বা রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়।  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেছেন, যেহেতু দুই দলের নেতৃত্বেই রাজনীতি মেরুকরণ হয়, ফলে আওয়ামী লীগকে বিএনপিকে বিবেচনায় নিতে হয়। আর সেজন্য নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের নেতৃত্বকে অযোগ্য দেখানোর চেষ্টা থাকতে পারে বলে তার ধারণা।  ‘বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে যে আইনগত অযোগ্যতা রয়েছে, সেটাই আওয়ামী লীগ দেখাতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে।’  বিশ্লেষকদের অনেকে আবার ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিনাত হুদা বলছিলেন, আওয়ামী লীগ তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জ হবেন, তারেক রহমান সেই অবস্থান তৈরি করতে পারেননি বলে তিনি মনে করেন।  ‘বিএনপির এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নেতৃত্বের সংকট। এখন তারেক রহমানও জনপ্রিয়, কিন্তু তিনি যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন করতে পারেন বা পাল্টে দিতে পারেন, এমন কোনো নেতা নন। তিনি এখন পর্যন্ত তার প্রমাণ দিতে পারেন নাই। ফলে তিনি আওয়ামী লীগের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিজেকে দাঁড় করাতে পারেননি।’  তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলেও সেখান থেকেই তিনি এখন বিএনপির হাল ধরেছেন।  তার মা এবং দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর তাকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তার পিছনে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার কথা বলা হচ্ছে। এখন রহমানের নির্দেশনায় বিএনপি পরিচালিত হচ্ছে বলেই দলটির নেতারা বলে থাকেন।  তাহলে নির্বাচনের জন্য তিনি কি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন? এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।  ‘তারেক রহমান এখনও বিএনপির জন্য ফ্যাক্টর। পারিবারিক ক্যারিশমার উত্তরাধিকার তিনি বহন করেন। কিন্তু তিনি নির্বাচনের জন্য ফ্যাক্টর হবেন কিনা, এতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।কারণ তিনি লন্ডন থেকে ঢাকা আসতে পারছেন না। তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা আছে। ২১শে অগাষ্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মতো মামলাও তার বিরুদ্ধে আছে। এধরণের মামলায় দন্ডিত হলে অপরাধগুলো মৃত্যুদন্ডযোগ্য। সুতরাং তিনি ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরবেন না।’  ‘নেতাকর্মিদের চাঙ্গা করতে মাঠে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আর আমরা যতদুর জানি যে, তারেক রহমানকে নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যেও অনেক বিতর্ক আছে। সুতরাং সবদিক দিয়েই তারেক রহমানের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রাসঙ্গিকতা কমে যাচ্ছে’।  এবারই প্রথম নয়, এরআগেও আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকে বিভিন্ন সময় তারেক রহমানের সমালোচনা করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন।  সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতাদেরও অনেকে অভিযোগ করছেন যে, রহমানকে নিয়ে আওয়ামী লীগে ভীতি কাজ করে এবং সেজন্য তাকে হুমকি মনে করে।  কিন্তু এমন অভিযোগ মানতে রাজী নন আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ।  ‘তারেক রহমানকে নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো মাথা ব্যাথা নেই, কারণ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মামলায় আদালত তাকে সাজা দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ কখনই তাকে প্রতিপক্ষ মনে করে না।’  তবে আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বি দল হিসেবে বিএনপিকে চাপের মধ্যে রেখেছে এবং আরও কোনঠাসা করতে চাইছে, সে অভিযোগ রয়েছে।  গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আওয়ামী লীগ তাদের কৌশলের অংশ হিসেবেই বিএনপি নেতার পাসপোর্ট জমা দেয়ার মতো বিষয় নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।  ‘খালেদা জিয়া অলরেডী কারাদন্ড ভোগ করছেন। সেক্ষেত্রে দলকে কিছুটা নির্দেশনা দিতে পারেন তারেক রহমান। কিন্তু তার এই অবস্থা। সুতরাং আওয়ামী লীগ বিএনপির বিরুধে একটা যুগপৎ আক্রমণ চালাতে চাইছে। এক, বিএনপিকে ক্রমাগত কোনঠাসা করা। দুই, বিএনপির অবশিষ্ট নেতাদের সবাইকে চাপের মধ্যে রাখা। এবং তারেক রহমানকে তারা সেজন্যই টার্গেট করছে।’  তিনি আরও বলেছেন, ‘পাসপোর্ট বিতর্ক যেটা আওয়ামী লীগ বিক্রি করতে চাইছে, সেটা হচ্ছে, এটা দেখানো যে তারেক রহমানের দেশের প্রতি কোনো আনুগত্য নাই। আর নাই বলেই তিনি পাসপোর্ট সারেন্ডার করেছেন। এখন মানুষতো আর এতো খতিয়ে দেখে না যে, কি প্রক্রিয়ায়, কেন, কি জন্য মানুষ পাসপোর্ট সারেন্ডার করে। এটা হয়তো কিছুটা কাজ করতেও পারে জনমনে।’  বিশ্লেষকদের অনেকে আবার পরিস্থিতিটাকে দেখছেন ভিন্নভাবে।  অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা মনে করেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক হালকা বিষয়ও বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়।  ‘নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কথাবার্তা আপনি দেখবেন। এটা এমন না যে, এটা নতুন, এবং দেখবেন রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় নানান ধরণের কথা বলে থাকে, যেটা হাস্যকর ঠেকে। যেটার কোনো ফলাফল আসলে হবে না। নেগেটিভ প্রচারণাও এক ধরণের প্রচারণা।’  দশ বছর আগে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন তারেক রহমান।  পাঁচ বছর আগে তিনি ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ে চেয়ে আবেদন করেছিলেন।  ব্রিটিশ সরকার আবেদন গ্রহণ করেছে এবং তার বাংলাদেশী পাসপোর্ট লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠিয়েছে।  কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষতির আশংকা থেকে বিএনপি এতদিন ব্রিটেনে তারেক রহমানের রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়ার বিষয়টি প্রকাশ না করে বলে আসছিল যে, তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছেন।  এখন বিতর্কের প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে দূরে সরানোর কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ।  ‘বিএনপিকে কিভাবে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়, বেগম খালেদা জিয়াকে কিভাবে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা যায়,তারেক রহমানকে কিভাবে দূরে সরানো যায়, সেই চেষ্টাইতো তারা করে আসছে।’  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ব্রিটিশ সরকারের কাছে রহমানের বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা দেয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে তার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জনের কথা বলেছেন।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেউ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করতে চাইলে তাকে নিজেকে সে ব্যাপারে আবেদন করতে হয়।  তারেক রহমানের সে রকম কোন লেখা চিঠি বা আবেদন সরকার এখনও দেখাতে পারেনি।  এ ধরণের অভিযোগ তোলার পাশাপাশি তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার চিন্তাও আওয়ামী লীগে রয়েছে।  তারেক রহমানকে যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছে, তা নিয়ে দু’দিন আগে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মন্তব্য করেন।  ‘সে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামী, এটা ভুলে গেলে চলবে না।দুইটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আরও মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। আরও মামলা রয়েছে।অনেক দেশ থেকে আমরা এ ধরনের আসামী ধরে নিয়ে আসি, সেখানে ব্রিটিশ সরকারের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে।বরং আমি অবাক হই বিএনপির বিষয়ে। এধরণের একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে তারা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছে। বিএনপি কি বাংলাদেশে একজন নেতাকেও খুঁজে পেলো না?’  ক্ষমতার রাজনীতি যেহেতু এখন বড় বিষয়। সেই রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে এ ধরণের বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন অধ্যাপক জিনাত হুদা। ‘বেলা শেষেতো আসলে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, এ দু’টিই প্রধান দল। যেহেতু আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসতে চায়।আর বিএনপিও মরিয়া যে, যাতে করে কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ তৃতীয়দফায় ক্ষমতায় আসতে না পারে। সুতরাং আমার মনে হয়, রাজনৈতিক সমীকরণটি খুব স্পষ্ট এখানে।’