সুবিধাবঞ্চিত ঢাকার দুই সিটির মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা

দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি) সড়ক শ্রমিক, মশক নিধনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বিদ্যুৎ শ্রমিকেরা। অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। সাপ্তাহিক ছুটি, ঈদ, পূজা কিংবা মে দিবসেও ছুটি পান না তারা। পেলেও ছুটির সময়ের বেতন পান না। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন যে পরিমাণ টাকা দেয় তাদের, তা বর্তমান সময়ের তুলনায় অপ্রতুল। এরপরও তারা নাগরিকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।  জানা গেছে, দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ৫ হাজার ২১৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ২৭৮ জন মশক নিধনকর্মী আছেন। উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩ হাজার ১০০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ৩০০ জনের মতো মশক নিধনকর্মী আছেন। এ ছাড়া দুই সিটিতে দুই শতাধিক সড়ক ও বিদ্যুৎ শ্রমিক রয়েছেন। এসব শ্রমিকের মধ্যে মশক নিধনকর্মী ছাড়া সবাই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া। এ কারণে তারা সরকারি ছুটির আওতায় নেই। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঈদ-পূজাসহ সরকারি ছুটির দিনেও দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। এসব দিনে ছুটি চাইলেও সচরাচর পাওয়া যায় না। আর পেলেও ছুটিকালীন বেতন নেই তাদের।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সবাই দৈনিক মজুরিতে নিয়োগ পাওয়া। এদের অধিকাংশের নেই আবাসন সুবিধা। নেই স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সন্তানদের পড়ালেখার ব্যবস্থা। নগরীর দেড় কোটি মানুষের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত এসব শ্রমিককে মৃত্যুর পর দাফনের জন্য দেওয়া হয় ৭ হাজার টাকা। তবে কর্মরত অবস্থায় কেউ মারা গেলে মেয়রের বিশেষ ফান্ড থেকে একজন কর্মী ৫০ হাজার টাকা পান। তবে এর পেছনে খরচ হয়ে যায় অনেক। টাকা পেতে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস।  দৈনিক মজুরি ও স্কেলভুক্ত— এ দুই শ্রেণির কর্মীদের দিয়ে দুই সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতার কাজ করে থাকে। এর মধ্যে দৈনিক মজুরিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের আবার দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করে মজুরি নির্ধারণ করা হয়— দক্ষ ও অদক্ষ। দক্ষ ও অনেক পুরনো কর্মীরা পান দৈনিক ৫০০ টাকা। আর অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ ও নতুন কর্মীরা পান ৪৭৫ টাকা করে। দীর্ঘসময় কাজের অভিজ্ঞতার পর ইনক্রিমেন্ট হিসেবে তাদের পারিশ্রমিক বাড়ে মাত্র ২৫ টাকা।  জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম  বলেন, ‘আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সবাই দৈনিক মজুরিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া। এর অর্থ হচ্ছে— যে দিন তারা কাজ করবেন সেদিন তারা বেতন পাবেন, যেদিন কাজ করবেন না সেদিন তারা বেতন পাবেন না। তাছাড়া বছরের প্রতিদিন আমাদের নগরসেবায় কাজ করতে হয়। সরকারি ছুটিতে আমাদের কর্মীদের কোনও ছুটি নেই। তারা ছুটি নিলে নিয়ম অনুযায়ী আমরা বেতন দিতে পারি না।’  ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী আমরা কাউকে বেতনসহ ছুটি দিতে পারছি না। তবে বিনাবেতনে ছুটি দেওয়া হয়। তাছাড়া কর্মীদের সব মানবিক দিক বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর বাইরে আমরা কোনও পরিচ্ছন্নতাকর্মী অবসরে গেলে তাকে এককালীন বড় অঙ্কের একটা অ্যামাউন্ট দিয়ে থাকি। তাদের চিকিৎসার জন্য ডিএনসিসির পক্ষ থেকে একটি ক্লিনিকের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৫০০ পরিচ্ছন্নকর্মীর শরীরে ক্যান্সার জীবাণু রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়েছে। এটা সত্য যে নিয়ম অনুযায়ী তারা সরকারি কোনও ছুটির দিনে ছুটি কিংবা অতিরিক্ত ডিউটির জন্য ওভার টাইম পান না।’  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নকর্মীদের সংগঠন স্ক্যাভেঞ্জার্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ  বলেন, ‘সুযোগসুবিধা বলতে আমাদের কিছুই নেই। অথচ আমরাই নগরবাসীকে সেবা দিয়ে থাকি। আমাদের নিয়েই সিটি করপোরেশন সুনাম অর্জন করে। একদিন যদি আমরা কাজ বন্ধ করে দিই তাহলে পুরো ঢাকা ময়লা ঝুড়িতে পরিণত হবে।’  তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আজকের দিনটি (মে দিবস) শ্রমিকদের জন্য। এই দিনেও আমাদের কাজ করতে হয়েছে। আমাদের কোনও ছুটি নেই। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও কাজ করতে হয়। ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত আমাদের ডিউটি। কিন্তু এরপরও যখন ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়, গাছপালা ভেঙে পড়ে, তখন আমাদের মাঠে নামতে হয়। ওভারটাইম বা ঝুঁকি ভাতা বলতে কিছুই নেই। শুধু দৈনিক বেতনটাই আমরা পেয়ে থাকি। ঈদের দিনেও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কাটাতে পারি না। এটা একটা মানবিক সমাধান হওয়া উচিত।’  দুই সিটির স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক মশক নিধনকর্মী জানান, মশা নিধনের কাজে ব্যবহৃত অনেক ফগার মেশিন পরিচালনার সময় অতিরিক্ত গরম হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। কখনও কখনও আগুন ধরে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মশককর্মীদের জনরোষের সম্মুখীন হতে হয়। কয়েক বছর আগে এক কর্মী মেশিনের আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত নাগরিক সেবায় নিয়োজিত থাকলেও তাদের কোনও ঝুঁকি ভাতা নেই। তারাও সরকারি ছুটি পান না।  জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার  বলেন, ‘দৈনিক মজুরিভিত্তিতে হোক আর যেই পদ্ধতিতে হোক, সপ্তাহে একদিন ছুটি শ্রমিকের প্রাপ্য। ঈদ-পূজাসহ সরকারি ছুটির দিনে বেতনসহ তাদের ছুটি দিতে হবে। সরকার যে জায়গায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব কাজে উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করছে সে জায়গায় যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই শ্রমিকের সেই অধিকার পূরণ না করে তাহলে শ্রমিকের অধিকার বাস্তবায়িত হবে কীভাবে? সিটি করপোরেশন তার নিজস্ব আইনে যেভাবে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে, এটা শ্রমিকের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বেআইনি। শ্রম আইনে এ ধরনের কোনও বিধান নেই।’