বাড়েনি রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ, কমছে রিজার্ভ

 চলতি অর্থবছর দেশে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। সে তুলনায় বাড়েনি রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ। ফলে চলতি হিসাবে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চলতি হিসাবের এ ঘাটতি নেতিবাচক ধারায় নিয়ে গেছে ব্যালান্স অব পেমেন্টকেও। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ দুই নির্দেশকের নিম্নমুখিতায় কমতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩০ জুন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি ২৯ লাখ (প্রায় সাড়ে ৩৩ বিলিয়ন) ডলার। চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে তা ৩ হাজার ১৯৩ কোটি ডলারে নেমে আসে। আর ২৫ এপ্রিল রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ৩১৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। সূত্র: বণিক বার্তা  যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মাধ্যমে জানুয়ারি-মার্চ সময়ের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ আবারো ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসবে।  জ্বালানি তেলসহ বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের নিম্নমুখী দর কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল আশীর্বাদ। একই সময়ে দেশের খাদ্য উত্পাদনেও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমদানি ব্যয় কমায় বাড়তে থাকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ২৩০ কোটি ডলার। এরপর ২০১৫ সাল শেষে এর পরিমাণ ২ হাজার ৭৪৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে ৩ হাজার ২০৯ কোটি ডলারে উন্নীত হয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এর পর থেকে বাড়া-কমার মধ্য দিয়ে গেছে রিজার্ভের পরিমাণ।  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুই খাত রেমিট্যান্স ও রফতানি। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি যেভাবে বাড়ছে, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় সেভাবে বাড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমে যায় সাড়ে ১৪ শতাংশ। অর্থবছরটিতে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। যদিও এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ১১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। তবে চলতি অর্থবছরের নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৭৬ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ১৭ শতাংশ বেশি। আর দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল ২০১৪-১৫ অর্থবছরে। বছরটিতে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠিয়েছিলেন ১ হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার।  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেক খাত রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধিও অনেকটা শ্লথ। ২০১৬-১৭ অর্থবছর রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৩ হাজার ৪২৪ কোটি ১৮ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে হয় ৩ হাজার ৪৮৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আর চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রফতানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৭৯১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। যদিও এর আগের কয়েক বছর রফতানি আয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ২০১২-১৩ অর্থবছরের ২ হাজার ৭০২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছর দেশে রফতানি আয় আসে ৩ হাজার ১৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। এছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১২০ কোটি ৮৯ লাখ ডলার।  যদিও আমদানি ব্যয় বাড়ছে আরো বেশি। হাওড়সহ দেশের উত্তর ও মধ্য অঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চালসহ খাদ্যশস্য উত্পাদন। অভ্যন্তরীণ চাহিদার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ফলে আমদানি করতে হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য। একই সঙ্গে চলছে পদ্মা সেতু, রূপপুর ও রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের মতো বৃহত্ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি।  বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১১৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পুরো সময়ে এ ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৩৬৬ কোটি ২৯ লাখ ডলার। তার আগের অর্থবছর (২০১৫-১৬) আমদানি বাবদ বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হয়েছিল মোট ৪ হাজার ৯ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। এছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৫৭ কোটি ৯২ লাখ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ৭৩ কোটি ১৯ লাখ ডলার।  দেশে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুই বছর ধরেই নেতিবাচক চলতি হিসাবের ভারসাম্য (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স)। এর ধাক্কা লেগেছে রাষ্ট্রের ব্যালান্স অব পেমেন্টে। ফলে টান পড়েছে বাড়তে থাকা রিজার্ভে।  বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের তুলনায় এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশের আমদানি ব্যয় বেশি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ও ব্যালান্স অব পেমেন্টে। অনেক দিন ধরেই অর্থনীতির এ দুটি সূচক নেতিবাচক। এর প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে। কয়েক মাস ধরেই রিজার্ভ ৩১ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠানামা করেছে। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন থাকলেও আকুর বিল পরিশোধের ফলে এটি আবারো ৩১ বিলিয়নে নেমে আসবে।  তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নানামুখী তত্পরতায় চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি এসেছে। সামনে রমজানসহ দুটি ঈদ উত্সব আছে। এ সময় প্রবাসীরা আরো বেশি রেমিট্যান্স পাঠাবে। আশা করছি, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের এ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিক থাকলে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামবে না।  রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলতি হিসাবে রেকর্ড ৬৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময় পর্যন্ত ঘাটতি ছিল ৯৬ কোটি ডলার। যদিও এর আগের অর্থবছর ৪২৬ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। এ ধারাবাহিকতা বজায় ছিল আগের অর্থবছরগুলোতেও।  সাম্প্রতিক সময়ের এ ঘাটতির কারণে বাজারে ডলারের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত ডলার ছাড়লেও শান্ত হচ্ছে না বাজার। আন্তঃব্যাংক লেনদেনেই ৮৫ টাকায় উঠে গেছে প্রতি ডলার।  ব্যালান্স অব পেমেন্টে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে জানিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, অনেক দিন থেকেই সরকারের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স নেতিবাচক ধারায় চলছে। রেকর্ড পরিমাণ এ ঘাটতির প্রভাব পড়েছে ব্যালান্স অব পেমেন্টে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। তিনি বলেন, কয়েক অর্থবছর ধরেই বিশ্বের পণ্যবাজার স্থিতিশীল ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উত্পাদনও ছিল রেকর্ড পরিমাণ। ফলে ধারাবাহিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছিল। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার অস্থিতিশীল। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্যও বড় বড় এলসি খুলতে হচ্ছে। এর কারণেই রিজার্ভে টান পড়েছে। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ানোর মাধ্যমে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সকে ইতিবাচক ধারায় আনতে হবে।