দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনই আ.লীগে কোন্দলের কারণ

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ায় সারাদেশে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মাত্রা চরম আকার ধারণ করছে। এসব নির্বাচনে প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তার কোন্দলের আগুনে ঘি ঢেলে দিচ্ছে। এছাড়া দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের মধ্যে সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। আর আদর্শিক নেতার সংখ্যার অপ্রতুলতাও কোন্দল জিইয়ে রাখছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

IFrame

তাদের মতে, সারাদেশে বেশির ভাগ দলীয় কোন্দলই সৃষ্টি হয় বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে। একইসঙ্গে নিজেকে শক্ত প্রার্থী হিসেবে মাঠে জানান দিতে আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠায় নেমে পড়াও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়াচ্ছে।

কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারটি পুরনো হতে থাকলে এ অবস্থার পরিবর্তন আসবে। তাদের মতে পদ-পদবিও কোন্দলের আরেকটি বড় কারণ।

এদিকে দ্বন্দ-কোন্দল নিয়ে দুশ্চিন্তা পেড়ছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা মনে করেন, কোন্দল দূর করতে না পারলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের মাশুল দিতে হতে পারে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ  বলেন, ‘দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের মধ্যে সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হয়েছে। তারা পদ-পদবি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু বাগিয়ে নিতে চায়। আর এ কারণে দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব-কোন্দল দেখা দিয়েছে। আমরা এ পরিস্থিতি নিরসন করার চেষ্টা করছি।’ স্থানীয় নির্বাচনগুলোও দ্বন্দ্ব-কোন্দল সৃষ্টি করার অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক  বলেন, ‘আধিপত্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়া ও পদ-পদবি ভাগিয়ে নেওয়ারসহ নানা কারণে দলের তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনা বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘দলে আদর্শিক কর্মীর সংখ্যা কমে গেছে বলে এসব কারণ নিয়ে দলে কোন্দল অব্যাহত আছে।’

ফজলুর রহমান ফারুক দাবি করেন, ‘আদর্শিক কর্মী আমরা যে কজন আছি, তারাই। আর নাই।’ তিনি বলেন, ‘দলও অনেক বড় হয়েছে, আগাছা-পরগাছাও অনেক জন্ম নিয়েছে। তারা কোন্দল জাগিয়ে রাখতে চায়। আগাছা ঘরে ঢুকে যাওয়া ফসল ঘরে তুলতে দিতে চায় না।’ ফজলুল রহমান বলেন, ‘ ভারতের  কংগ্রেস ও সিপিআই (এম)-এর মতো মাল্টি ও জাস্টিফায়েড অরগানাইজেশন এসব কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’ কোন্দল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নীতি-নির্ধারকরা জানান, সারাদেশে প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে একাধিক প্রার্থীর ছড়াছড়ি। আওয়ামী লীগ একটি বড় দল হওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশি থাকবে, এটা স্বাভাবিক মনে করা হলেও এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা অসুস্থ পর্যায়ে চলে যাওয়ার ঘটনা একেবারেই অস্বাভাবিক। আর তাই আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের অভ্যন্তরের কোন্দল নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।

সবশেষ দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায়ও বিষয়টি ‘এজেন্ডা’ হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে। কোন্দলের কারণ উদঘাটন করতে ওই বৈঠক থেকে দলের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও চারজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে দিয়ে কমিটি করে দেওয়া হয়। ওই কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতেও বলা হয়েছে কার্যনির্বাহী সংসদের সভা থেকে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা এই নির্দেশ দেন।

কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এমন দুজন সদস্য  জানান, সারাদেশের কোন্দলের কারণ তুলে আনতে তারা কাজ করছেন। তারা অনেক তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে।

জানা গেছে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন রীতি চালু হওয়ায় এবং দল ক্ষমতায় থাকায় তৃণমূলে অনেকেই রয়েছেন যারা যেকোনও নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন নিতে উঠেপড়ে লাগেন। তাদের মধ্যে যোগ্য-অযোগ্য দুই ধরনের নেতাকর্মীই থাকেন। বিবদমান গ্রুপগুলো নিজেদের শক্তি জানান দিতে মারামারিতে পর্যন্ত জড়ায়। একপর্যায়ে এটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা হয়ে উঠে। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়।

আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, তারা বিভিন্ন মাধ্যমে দলের অভ্যন্তরে গ্রুপিংয়ের কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও কথা বলে গ্রুপিংয়ের কারণগুলো জানার চেষ্টা করছেন। সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোই গ্রুপিংয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া পদ-পদবি পাওয়াও গ্রুপিংয়ের আরেক কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, দল ক্ষমতায় থাকায় পদ-পদবি বাগিয়ে নেওয়ার একটা মানসিকতা কাজ করে সবার মধ্যে। দেখা গেছে, তৃণমূলে দুটি শ্রেণি আছে। একটি শ্রেণি রয়েছে, পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে সুবিধা ভোগ করা তাদের মূল্য উদ্দেশ্য, সংগঠনকে শক্তিশালী করা নয়। আর একটি অংশ আছে, যারা শেখ মুজিবের আর্দশ কীভাবে সমুন্নত রাখবে, দলকে কীভাবে সুসংগঠিত করবে সেই চিন্তায় থাকে। সুবিধাভোগীদের কাছে আর্দশের সৈনিকরা পিছিয়ে পড়েন। ফলে এদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় তৃণমূলে বিভিন্ন সুবিধাভোগী বলয় গড়ে উঠেছে। সুবিধাভোগী এই বলয়টি নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে আর্দশিক নেতাকর্মীদের চাপে রাখতে চায়। ফলে সুবিধাভোগী, সুবিধাবঞ্চিত ও আদর্শিক নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে থাকে। এতে করে দলের সর্বস্তরে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করছে।

নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, ‘কোন্দলের কারণ সবার জানা।’ তবে তিনি বলেন, ‘দলীয় কর্মকাণ্ড যত বাড়বে কোন্দল তত কমে আসবে। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা বলে একটা কথা আছে। দলীয় কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকলে নেতাকর্মীরা আবার একজোট হবে।’