তারেক রহমানের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আইনজীবীদের

 পাসপোর্টের নাগরিকত্ব বিষয়ে তারেক রহমানকে নিয়ে একের পর এক বিতর্ক যখন তুঙ্গে তখন দেশের আইনজীবীরা এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।  সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর নানা আলোচনা চলছে। মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন আইনজীবীরা। অনেকে এটিকে অযথা আলোচনা বলে মন্তব্য করেছেন। অনেকে আবার পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীর কথায় সায় দিয়েছেন। তবে আইনজ্ঞরা জানান, এটি আগেই নির্ধারিত হয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনে। কেউ কেউ বলছেন পাসপোর্টের সঙ্গে নাগরিকত্বের সর্ম্পক নেই।  জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া আর নাগরিকত্ব এক জিনিস নয়। নাগরিকত্ব আইন ও পাসপোর্ট আলাদা। পাসপোর্ট না থাকলেও নাগরিকত্ব যায়না। নাগরিকত্ব ছাড়তে হলে আবেদন করে বলতে হবে। অন্যদেশের পাসপোর্ট গ্রহণ করলেও নাগরিকত্ব যায়না। ইউরোপিয়ান কান্ট্রি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে দ্বৈত নাগরিকত্ব চলে।   তিনি বলেন, এর আগে গোলাম আযমের সময় এগুলো নির্ধারিত হয়েগেছে। গোলাম আযম পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে এসেছিল। পরে সরকার তার নাগরিকত্ব বাতিল করলে সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে সে তা ফেরত পায়। আমাদের দেশের নাগরিকত্ব আইনে বলা আছে, যারা ব্রিটিশ আমল থেকে, ৪৭ এর পর থেকে, পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে বসবাস করেছে তারা এদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হবে। ব্রিটিশ আমলেই হোক আর পাকিস্তান আমলেই হোক যারা এ অঞ্চলে বসবাস করেছে তারা এদেশের নাগরিক। এগুলোকে অযথা বিতর্ক বলে উল্লেখ করেন তিনি।  তারেক রহমানের আইনজীবী কায়সার কামাল বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য বানোয়াট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এজন্যে শাহরিয়ার আলমকে একটি আইনি নোটিশও পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ একটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। অতএব অন্য কোন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রশ্নই আসে না। তিনি ওই দেশের অভিবাসন আইন অনুযায়ী বৈধভাবে আছেন। চিকিৎসা শেষ হলে তিনি আবার দেশে ফিরে আসবেন।  ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে সে দেশে থেকে যেতে চাইলে এবং এ দেশে আর না আসতে চাইলে নাগরিকত্ব ছাড়তে হবে। তবে সাময়িকভাবে আশ্রয় চাইলে নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়না। তবে তারেক রহমান কি চেয়েছেন, সে বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।  সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, বিদেশে অবস্থানরত কোন ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করতে চান, তাহলে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করতে হবে। এ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট একটি ফর্ম আছে। যাচাই-বাছাই করে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রত্যয়ন দেয় যে, আবেদনকারীর নাগরিকত্ব বাতিল বা বর্জন করা হয়েছে।  আইনজীবী ড. কাজী আকতার হামিদ বলেন, কোন ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ বা বর্জন করতে চান, তাহলে প্রথমেই তাকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট সারেন্ডার করতে হবে। তবে সেই ব্যক্তি যদি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হন তাহলে যেকোনো সময় নিজের পাসপোর্ট পুনরায় ফেরত চাইতে পারবেন।  এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, তারেক রহমান তার পাসপোর্ট ব্রিটিশ হোম অফিসে জমা দিয়েছেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য। তবে তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেননি। পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীর দেখানো চিঠিতে ১৩ টি ভুল চিহ্নিত করেন ফখরুল। তিনি বলেন, ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে এ ধরনের ভুল করা অস্বাভাবিক। একে রহস্যজনক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।  একইদিন একই কথা জানান সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীনও। জয়নুল বলেন, তারেক রহমান সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। আর ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন জানিয়েছেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কখনো বাতিল হয়না। খোকন বলেন, পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী যে চিঠি প্রকাশ করেছেন, সেখানে বেশ কিছু ভুল রয়েছে। তাদের সন্দেহ এটি জাল। তিনি বলেন, এটি ২০১৪ সালের চিঠি। নির্বাচনকে সামনে রেখে এতদিন পর কোন উদ্দেশ্যে এটি প্রকাশ করা হলো? আগে এই চিঠির সত্যতা প্রমান করা উচিৎ বলে মনে করেন খোকন।  এমনকি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের উপস্থাপিত যুক্তরাজ্যের নথি নকল বলে দাবি করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাও। ওই চিঠির বেশ কয়েকটি ভুল ধরিয়ে দিয়ে মান্না বলেন, একটা দলিল নকল করবার সময় যখন ভুল হয়, তখন বুঝতে হবে যিনি নকল করছেন, তিনি টেনশনে আছেন। না হলে এত ভুল হয় না।  তবে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মনে করেন, তারেক রহমান পাসপোর্ট সমর্পন করে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি বলেন, তারেক রহমানের কাছে পাসপোর্ট নেই। কোনো নাগরিক দেশে থাকলে এ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। আর যখনি তিনি বিদেশে থাকবেন, তার পাসপোর্ট কাছে রাখতে হবে। কিন্তু এটি জমা দিয়ে দিলে তার অবস্থা দাঁড়ায় তিনি পলাতক আসামি। আর বিএনপি এই ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করছে বলেও মন্তব্য করেন মাহবুবে আলম।  এদিকে সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, পাসপোর্ট হচ্ছে ট্রাভেল ডকুমেন্টের মত। বাইরে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট প্রয়োজন হয়। বাইরে গিয়ে আপনি যে বাংলাদেশের নাগরিক এই পাসপোর্টই সেটার আইডেনটিটি। তারেক রহমান যাওয়ার সময় মুচলেকা দিয়ে গিয়েছেন এবং গিয়ে পাসপোর্ট সারেন্ডার করেছেন। তার মানে তিনি স্বেচ্ছায় বলেছেন, আমি বাংলাদেশের নাগরিক থাকতে চাই না। এখন তার স্ট্যাটাস হচ্ছে তিনি ব্রিটেনের রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। যুক্তরাজ্য তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে কি না আমার কাছে সে সম্বন্ধে কোনো তথ্য নেই। তিনি আরো বলেন, এই মুহূর্তে তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ডিনাই করেছেন। কিন্তু তার মানে এই না ভবিষ্যতে তিনি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হতে চান তাহলে আর পারবেন না।