সাভারে রানা প্লাজা ধসের ৫ বছরেও ক্ষতিপূরণ পাননি অনেকেই

স্টাফ রিপোর্টার : সাভারের রানা প্লাজা ধসের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ৫ বছর। দিনটির ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা বিশ্ব মর্মাহত। ভবন ধ্বসের এ ঘটনায় ভবনে থাকা পাঁচটি পোশাক কারখানার ১ হাজার ১৪২ জন শ্রমিক-কর্মচারী নিহত হন। একই ঘটনায় আহত হন আরও কয়েক হাজার। এদের অনেকেই সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। পরিচয়-সঙ্কটের কারণে ক্ষতিপূরণের অর্থ পৌঁছায়নি দেড় শতাধিকের বেশি নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে। এখনও ক্ষতিপূরণের আশায় প্রতীক্ষার প্রহর গুণছেন অনেক স্বজনহারা পরিবারগুলো। এখনো ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছে অনেককে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভারে নয় তলা ভবন রানা প্লাজার পাঁচটি কারখানার শ্রমিকরা যে যার মতো করে কাজে যোগ দিচ্ছেন। তখনও তারা জানতেন না কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। সকাল সাড়ে ৮টায় একযোগে চালু করা হয় ডজন খানেক জেনারেটর। কেঁপে ওঠে পুরো নয় তলা ভবনটি। এর কিছুক্ষণের মধ্যে বিশাল এ ভবনটি ধসে পড়ে। সাথে সাথে ঝড়ে যায় হাজার শ্রমিকের প্রাণ। ভবনে আটকে পড়া ও হাসপাতালে মারা যাওয়াসহ সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৮ জনের। ঘটনায় আহত হন আরও কয়েক হাজার। দেশের ইতিহাসে ভবন ধসে একসঙ্গে এত শ্রমিক মারা যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।

শ্রমিকদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, আগে থেকেই ফাটল ধরেছিল ওই ভবনে। হরতাল  থাকা সত্বেও  কাজে আনা  হয়েছিল শ্রমিকদের।  ঝুঁকিপূর্ণ ওই ভবনে ছিল বিশাল আকৃতির একটি জেনোরেটর। আর এক সঙ্গে কাজ করতো সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক। ভূগর্ভস্থ তলায় ছিলো গাড়ি রাখার জায়গা। দ্বিতীয় তলার বিপণিকেন্দ্রে বহু দোকান ছিল। তৃতীয় থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত পোশাক কারখানা। এর ওপরের দুটি তলা খালি ছিল। ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল প্রথম তলায়। ২৩ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে ফাটল নিশ্চিত হওয়ার পর ভবন ছেড়ে চলে যেতে বলা সত্ত্বেও, অনেক গার্মেন্টস শ্রমিকদের পরের দিন কাজে ফিরতে বলা হয়, তাদের সুপারভাইজার ভবনটিকে নিরাপদ ঘোষণা করে। ২৪ তারিখ ৯তলা ভবনটি সকাল পৌনে ৯টায় প্রথম তলা বাদে বাকি সবগুলো তলা ধসে পড়ে। ধসে পড়ার সময় ভবনটিকে প্রায় ৩ হাজার কর্মী ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত বেঁচে যাওয়া জানান, সকাল নয়টার দিকে হঠাৎ করে বিকট শব্দ এবং কাঁপনে তারা ভূমিকম্পের আশঙ্কা করেন। পরে বেরিয়ে দেখেন বিরাট এলাকা ধুলা বালিতে ধোঁয়াটে হয়ে পড়েছে। ভবনের নিচে চাপা পড়ে কর্মস্থলে হাজারের বেশি শ্রমিক মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। ওই ঘটনা ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক নিহত হয়।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলছে, রানাপ্লাজা ট্রাজেডির চার বছর পার হলেও এখনো ১৫৯ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে সব ধরনের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব শ্রমিকের পরিবার।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর উদ্যোগে বিভিন্ন সংস্থা থেকে রানা প্লাজায় নিহত শ্রমিকদের ৫১৩ শিশুকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আর বিলস থেকে ২৫ জন এতিম শিশুকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর বাইরে কয়েকটি ছোট ছোট এনজিও কিছু শিশুদের নিয়ে কাজ করলেও তেমন কোনো সুবিধা পায়নি বেশীর ভাগ শিশুরা।

সিপিডির একজন গবেষক জানান রানা প্লাজার ঘটনায় নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ৩৬৫ নিখোঁজ শ্রমিকের মধ্যে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ২০৬ জনের পরিচয় সনাক্ত হয়েছিল। তারা কিছু সহায়তা পেলেও বাকি ১৫৯ শ্রমিকের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে সব ধরনের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব শ্রমিকের পরিবার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঘটনায় নিহত শ্রমিকরা প্রতিশ্রুতির ক্ষতিপূরণের ৭০ শতাংশ পেলেও আহত, পঙ্গু ও চাকরি হারানো শ্রমিকরা রয়েছেন কষ্টকর জীবনে। ওই সময়ের অধিকাংশ শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান নিম্নমানের হয়েছে। অনেকে এখনো কাজ করার অনুপযোগী। সেই সময়ে আহত শ্রমিকরা তাৎক্ষণিক বিভিন্ন সংগঠনের সহায়তায় চিকিৎসা পেয়েছে। পরবর্তীতে ঢাকা ও সাভারের আশপাশের শ্রমিকরা কিছু সহায়তা  পেলেও বাইরের জেলাগুলোর শ্রমিকরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

একটি সূত্র জানায়, মোট ৩১ প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা এখন পর্যন্ত রানা প্লাজা ডোনার্স ফান্ডে অর্থ সহায়তা দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তহবিলে ২ কোটি ১৫ লাখ ৭২ হাজার ডলার জমা পড়েছে। তহবিলে প্রয়োজন ৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে ওয়ালমার্ট, প্রাইমার্কসহ ২০ ব্র্যান্ড তহবিলে সহায়তা দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এ পরিস্থিতিতে এসব ব্র্যান্ডকে তহবিলে অর্থ সহযোগিতা বাড়াতে অনুরোধ জানানো হয়েছে ক্লিন ক্লোথ ক্যাম্পেইনসহ (সিসিসি) বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে। তবে এসব নামি-দামি ব্র্যান্ডের মধ্যে ব্যতিক্রম হচ্ছে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক ব্র্যান্ড প্রাইমার্ক। ক্ষতিপূরণ বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতির ৯৫ শতাংশ এ পর্যন্ত পরিশোধ করেছে কোম্পানিটি।

আইএলও’র প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তহবিলের অর্থ থেকে গত বছর ৫ কিস্তিতে আহত ও নিহত শ্রমিক পরিবারের ২,৭৭০ জন তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের ৪০ শতাংশ পান। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার ৮৭২ টাকা। তবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের প্রাপ্ত সহায়তা ও এককালীন দেয়া ৫০ হাজার টাকা কর্তন করে রাখা হয়েছিল। আর এ বছর ৮ই এপ্রিল প্রথম কিস্তিতে ক্ষতিপূরণের বাকি ৬০ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ অর্থ দেয়া হয় ২৯৬৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে। যার পরিমাণ ৩১ কোটি ২ লাখ ৩ হাজার ৮৪১ টাকা। মোট ৬ কিস্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রদান করা হয় ৭৫ কোটি ৮৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৩ টাকা। সমস্ত টাকা ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও ‘বিকাশ’ একাউন্টের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ‘বিকাশ’ এর সার্ভিস চার্জ বাবদ ১ লাখ ৮২ হাজার ২৫০ টাকা ব্যয় হয়েছে।