ভারত সফরে কী পেল আ. লীগ

: সামনে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কে আসবে আগামীর ক্ষমতায়। নির্বাচন নিয়ে চলছে নানা মেরুকরণ। বিশ্ব শক্তি ও প্রতিবেশি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সহানুভূতি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। এরই মধ্যে বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা বিদেশ তথা বিশেষ করে প্রতিবেশি ভারত-চীন সফর করছেন।  আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দিল্লি সফরে গিয়েছিলেন। এই দলটি বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সোমবার দিনভর নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও তাদের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। এই সফরে আওয়ামী লীগের প্রাপ্তি নিয়ে নানা সমীকরণ চলছে।  সফর শেষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমাদের ক্ষমতার উৎস জনগণ। ক্ষমতায় কে আসবে না আসবে তা নির্ধারণ করবে জনগণ। নির্বাচন ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের তৎপরতা হয়, কিন্তু ভারত কখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না।’   আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের ভারত সফর শেষে মঙ্গলবার (২৪ এপ্রিল) বিকেলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চামেলী হলে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন ওবায়দুল কাদের। এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এবং জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ প্রতিনিধি দলের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।  বাংলাদেশে এটা নির্বাচনের বছর, ফলে তার আগে ভারতে আওয়ামী লীগের এই সফরকে অনেকেই বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কটা ঠিক কেমন? বাংলাদেশে গত প্রায় এক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা দলটিকে বিজেপি কী চোখে দেখে – আর বিরোধী বিএনপি সম্পর্কেই বা তাদের মনোভাব কী?  দিল্লিতে বিজেপি নেতাদের বক্তব্য অনেকটা পরিষ্কার ছিল। বছরদেড়েক আগে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বিদেশি অতিথি হিসেবে সামিল হতে বিজেপির যে প্রতিনিধি দলটি গিয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন দলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও এমপি বিনয় সহস্রবুদ্ধে।  ড. সহস্রবুদ্ধে বলছিলেন, ‘দুই দেশে দুটো দলের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষাকে বিজেপি বরাবর খুব গুরুত্ব দেয়- আর সেই জন্যই আওয়ামী লীগ নেতাদের এই সফর বিজেপির সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।’  আওয়ামী লীগ বা তাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ভারতে শুধু কংগ্রেস এবং নেহরু-গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ, এটাকেও নেহাতই একটা ভ্রান্ত ধারণা বলে মনে করেন তিনি।  ‘শেখ হাসিনা ভারত ও ভারতীয়দের কাছের মানুষ’  বিজেপি ভাইস-প্রেসিডেন্টের কথায়, ‘একজন ব্যক্তি, দলনেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা যে ভারত ও ভারতীয়দের কাছের মানুষ তাতে কোনও ভুল নেই। জীবনের একটা খুব কঠিন সময়ে তিনিও ভারতের সাহায্য পেয়েছেন। কিন্তু সেটাকে যদি শুধু একটা দল বা পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেটা মারাত্মক ভুল হবে!’  বস্তুত নরেন্দ্র মোদির গত চার বছরের শাসনে বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে, তা এই দু্ই দলে অনেকেরই প্রত্যাশার বাইরে ছিল। বিজেপি পলিসি রিসার্চ সেলের অনির্বাণ গাঙ্গুলি মনে করেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উন্নতির প্রভাবও পড়েছে দুই দেশের শাসক দলের সম্পর্কে।  তার কথায়, ‘বিজেপি সব সময় চায় বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক – গণতন্ত্রের ধারা বহমান থাকুক, আর তার মধ্যে দিয়ে সে দেশের পলিটি এগিয়ে যাক। আর পাশাপাশি সেখানে ‘ডিসরাপ্টিভ ফোর্স’বা গণতন্ত্র ধ্বংসকারী শক্তিগুলো যেন পর্যুদস্ত হয়।’  ‘আর এই যে একটা ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ ভারতে কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ, ব্যাপারটা আদৌ সেরকম কিছু নয়। ভারতে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকুক, আমরা সব সময় চেয়েছি পররাষ্ট্রনীতিতে একটা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। বিজেপিও বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগকে সেই দৃষ্টিতেই দেখে এসেছে’, বলছিলেন ড: গাঙ্গুলি।  কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিজেপির এই নিবিড় সম্পর্কের পটভূমিতেই এই প্রশ্নটাও ওঠা স্বাভাবিক যে বাংলাদেশে নির্বাচনের বছরে ভারতের শাসক দল কি সেখানে প্রভাব খাটাতে উদগ্রীব?  দিল্লিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের সোমবার মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করছেন বিজেপি নেতা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর, তিনি অবশ্য এই জল্পনা সোজা উড়িয়ে দিচ্ছেন।  তিনি বলেন, ‘আমরা কোনও দিনই কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাইনি, হস্তক্ষেপও করিনি। আমরা এটায় বিশ্বাস করি না, আর নিশ্চিন্ত থাকুন কোনও দিন করবও না!’  এদিকে সফর প্রসঙ্গে নানা প্রশ্ন নিয়ে দেশের রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ আশা করেন না বলে জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, পরিষ্কারভাবে একটা কথা বলতে চাই, আমাদের দেশের রাজনীতি নিয়ে আমাদের জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে।  প্রতিনিধি দলের প্রধান ওবায়দুল কাদের বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বিজেপির নতুন কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিদর্শন করেছি। তাদের সাথে অত্যন্ত সুন্দর আলোচনা হয়েছে। মোদীকে আমরা বলেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আপনি দুজনে মিলে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন। এতে আপনি ও আপনার সরকারের প্রতি ‘গুড উউল’ সৃষ্টি হয়েছে। তাই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন করলে ‘ট্রিমেন্ডাস গুড ইউল’ সৃষ্টি হবে। এটি একটি বাস্তবতা, এটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যাবে না।  সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা আমন্ত্রণ পেয়েই ভারত সফরে গিয়েছি, আনন্দ-ফূর্তি করার জন্য নয়। বিজেপির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হলে অসুবিধা কোথায়? দুই দেশের উন্নয়নে আমরা যে কারো সঙ্গে ভালো সম্পর্ক করতে রাজি। তাদের আমন্ত্রণেই আমরা সিরিয়াসলি আলাপ-আলোচনা করতে গেছি।  আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের ভারত সফরে যেসব আলোচনা হয়েছে তা কয়েকদিনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ করা হবে বলেও জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।  সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহি:বিশ্বের হস্তক্ষেপ আশা করে না আওয়ামী লীগ।  তিনি বলেন, ‘আমরা একটি রাজনৈতিক দল। আমরা আজ আছি, কাল না-ও থাকতে পারি। আমাদের ক্ষমতার উৎস দেশের জনগণ। দেশের জনগণই নির্ধারণ করবে কে ক্ষমতায় থাকবে, কে থাকবে না। এ নিয়ে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর করার কিছু নেই। আমরা আশাও করি না। এসব বিষয় আমরাই নির্ধারণ করব।’  তিনি বলেন, বিদেশী শক্তি আমাদের বন্ধু হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে, আমরা তা আশা করি না। আর ভারত অতীতেও আমাদের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করনি, এবারও করবে না। তাদের অনেক নেতার সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে।  সেতুমন্ত্রী বলেন, ভারতের ক্ষমতাসীন পার্টির আমন্ত্রণে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে পার্টি টু পার্টি আলোচনা হয়েছে। আমরা সব ইস্যু নিয়ে কথা বলেছি। সেগুলোর মধ্যে সীমান্ত চুক্তির জন্য আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছি।  তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসাও করেছে তারা। এই দু’জন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় ছিলেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। আমরা আশা করি তিস্তা চুক্তিও হবে। আমাদের পানির জন্য যে হাহাকার আছে তা উপস্থাপন করেছি। এই চুক্তি হলে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে।  বিএনপিকে নিয়ে বিজেপির ভাবনা তবে এটাও ঠিক যে বাংলাদেশে এখনও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃত বিএনপি-র সঙ্গে ভারতে বিজেপির কোনও সহজ, খোলামেলা সম্পর্ক গড়েই উঠতে পারেনি।  অনির্বাণ গাঙ্গুলি তার কারণটা ব্যাখ্যা করে বলছিলেন, ‘আপনার হয়তো মনে আছে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি যখন বাংলাদেশ সফরে যান, খালেদা জিয়া এসে দেখাও করেননি। সেটা ছিল পরিষ্কার কূটনৈতিক অসৌজন্য। তবে বাংলাদেশে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, আমরা সব সময়ই চাই সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে একটা ফ্রেমওয়ার্ক রেখে এগিয়ে যাক।’  ‘আমার ব্যক্তিগত মত হল বিএনপি যতক্ষণ না জামায়াত সম্বন্ধে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করছে, ততক্ষণ সম্পর্কে একটা অস্পষ্টতা রয়েই যাবে। আমরা কেউই তো বিচ্ছিন্ন নই- প্রত্যেকেই আমরা একটা আঞ্চলিক যোগসূত্রে বাঁধা- সেই সামগ্রিকতায় জামায়াতের পরিকল্পনা কী, বিএনপি-ই বা তাদের সম্পর্কে কী ভাবছে … এগুলো যতক্ষণ না পরিষ্কার হবে ততক্ষণ দীর্ঘমেয়াদে কোনও বন্ধনও গড়ে ওঠা সম্ভব হবে না বলে আমার ধারণা’, বলছিলেন তিনি।  ফলে আওয়ামী লীগ নেতারা যেভাবে সোমবার দিনভর দিল্লিতে পার্লামেন্ট থেকে রাজঘাট, বিজেপি দপ্তর থেকে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় চষে বেড়াচ্ছেন – বিএনপির জন্য আপাতত তা ভাবাও সম্ভব নয়।