বিজেপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ঢাকার রাজনীতিতে তোলপাড়

 ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ঢাকার রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য প্রতিবেশি রাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ফলে এ নিয়ে ব্যাপক সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনীতির অঙ্গন।  আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির শীর্ষ নেতারা। টানা দুই মেয়াদে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার টানা তিন দফা বিজয়ের মধ্য দিয়ে হ্যাটট্রিক করতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তারা।  দিল্লিতে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সম্মানে সোমবার রাতে বিজেপি আয়োজিত এক নৈশভোজে এ বার্তা দেন বিজেপি নেতারা। নৈশভোজে উপস্থিত একাধিক সূত্র তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।   সূত্রগুলো জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সম্মানে বিজেপি গতরাতে একটি আনুষ্ঠানিক নৈশভোজের আয়োজন করে ভারতের বাণিজ্য, শিল্প এবং এভিয়েশনমন্ত্রী সুরেশ প্রভুর বাসভবনে। নৈশভোজে বাংলাদেশ থেকে দিল্লি সফরে যাওয়া আওয়ামী লীগের ১৯ কেন্দ্রীয় নেতা এবং ভারতের বিজেপি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতা ও মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।  নৈশভোজের আগে শুভেচ্ছা বক্তব্যে সুরেশ প্রভু, বিজেপি সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব এবং ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এমজে আকবর আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। তারা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনার সরকারের ধারাবাহিকতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের চোখেমুখে ব্যাপক সন্তুষ্টির ছাপ ফুটে ওঠে বলে উপস্থিত ওই সূত্রগুলো জানায়।  আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের আগে প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতাসীনদের এমন আশাব্যঞ্জক বার্তাকে বেশ ইতিবাচকভাবে দেখেন আওয়ামী লীগের নেতারা। নৈশভোজে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলের নেতা সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখেন।  তবে বিজেপি নেতাদের এ ধরনের বক্তব্যকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিল্লির নগ্ন হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।  তিনি বলেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করবে বিজেপি নেতাদের এই বক্তব্যই প্রমাণ করে ভারত ঢাকার রাজনীতি হস্তক্ষেপ করছে। এ কথা আমরা আগে থেকেই বলে আসছি। ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণেই এই সরকার টিকে আছে। ভারতের দয়ায় আরেক দফা আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে পারলে দেশের সার্বভৌমত্বই হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক। তাই দেশবাসীকে সতর্ক হতে হবে।  তিস্তাচুক্তিতে আশ্বাস মোদীর: এর আগে বিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যুর মীমাংসা যেহেতু হয়েছে, সেহেতু তিস্তা নদীর পানিবণ্টনের সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে বলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আশ্বস্ত করেন নরেন্দ্র মোদী। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতারা এ তথ্য জানান।  আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, বাংলাদেশ সময় সাড়ে ৪টায় নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আওয়ামী লীগের ১৯ সদস্যের প্রতিনিধি দলের মধ্য থেকে ৫ জন অংশ নেন। তারা হলেন- দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, আব্দুর রহমান ওজাহাঙ্গীর কবির নানক। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ৪০ মিনিট আওয়ামী লীগের ৫ সদস্যের প্রতিনিধির সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন মোদি। এর আগে আওয়ামী লীগের ১৯ সদস্যের সবার সঙ্গে কুশলবিনিময় ও ফটোসেশনে অংশ নেন তিনি।  বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আমাদের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি, রোহিঙ্গা ইস্যু, তিস্তার পানিবণ্টনসহ নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে বর্তমান সরকারের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন নরেন্দ্র মোদি।  হানিফ বলেন, তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়ে আশাবাদ জানিয়ে মোদি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অমীমাংসিত প্রায় সব ইস্যুর যেহেতু সমাধান হতে শুরু করেছে, তাই তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে। মোদি এ সময় তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া স্থলসীমান্ত চুক্তি, ছিটমহলবিনিময় চুক্তি ও সমুদ্রসীমা বণ্টনের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।  আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, অচিরেই তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার যাতে সমাধান হয়, সে জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছেন আমাদের। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।  ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির আমন্ত্রণে গত রবিবার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল দিল্লি পৌঁছে। মঙ্গলবার প্রতিনিধি দলটির দেশে ফেরার কথা রয়েছে।  ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন— প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযূষকান্তি ভট্টাচার্য্য, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এ কে এম এনামুল হক শামীম, মিসবাহউদ্দিন সিরাজ, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণালকান্তি দাস, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক আবদুস সবুর, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন এবং সদস্য গোলাম কিবরিয়া রাব্বানী চিনু।