রানা প্লাজা ট্রাজেডি: বিচার এখনো কত দূরে?

 দু’হাজার তেরো সালের ২৪শে এপ্রিল সকালে সাভারে আট তলা রানা প্লাজা ভেঙে পড়ে ১১শ’র বেশি পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ছিল শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব-ইতিহাসেরই অন্যতম ভয়াবহ শিল্প-দুর্ঘটনা। কিন্তু একে কেন্দ্র করে করা মামলাগুলোর একটি ছাড়া বাকি প্রায় কোনটিরই আজও নিষ্পত্তি হয় নি।  এ ঘটনার পর মামলা হয়েছে মোট ১৪টি। এর মধ্যে রয়েছে অবহেলা-জনিত মৃত্যুর অভিযোগে পুলিশের মামলা, রাজউকের করা ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন এবং নিহত একজন পোশাক শ্রমিকের স্ত্রীর দায়ের করা খুনের মামলা। মূলত: ঘটনার পরেই সাভার থানা পুলিশ একটি মামলা করে। পরে একজন শ্রমিকের স্ত্রীও খুনের মামলা করলে দুটি মামলা একটিতে রূপ নেয় তদন্তের পর। খবর বিবিসি  অন্য আরেকটি মামলা হয়েছিলো ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত। বাকী এগারটি মামলা করেছিলো কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। এসব মামলার দিকে নজর রাখছিলেন বাংলাদেশের লিগাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট। সংস্থাটির আইন শাখার উপপরিচালক মোঃ বরকত আলী বলছেন, ‘এসব মামলার কোনটিরই চূড়ান্ত ফল আসেনি। তবে দুদকের মামলায় সাজা হয়েছে যদিও সেটি ছিল ভিন্ন মামলা।’   ‘মূলত সব মামলার প্রায় আসামিরা একই। অর্থাৎ একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছিলো ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগে। এখন শ্রম আদালতে এগারটি মামলা বিচারাধীন আছে। বিচারিক আদালতে ফৌজদারি মামলা ও ক্ষতিপূরণের মামলাও বিচারাধীন’ – বলেন তিনি।  অথচ রানা প্লাজার বিপর্যয়ের পরপরই ‘অবহেলা জনিত’ মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেছিলো সাভার থানা পুলিশ, যাতে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ও ওই ভবনের থাকা পোশাক কারখানার মালিকসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়৷ আর ইমারত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সোহেল রানা ও তার পিতা সহ মোট আসামীর সংখ্যা ১৮ জন।  মামলাগুলোতে বিভিন্ন সময়ে সোহেল রানা ও তার পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও সাভারের জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী, গার্মেন্টস মালিক ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জেলে যেতে হলেও এখন তারা সবাই জামিনে আছেন। পরে তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ভবন মালিক, গার্মেন্ট মালিক, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্তরের ৪১ জনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ এনে আদালতে অভিযোগ পত্র দেয়া হয়। কিন্তু বিচারের ক্ষেত্রে কোন অগ্রগতি নেই বলে দাবি করেছেন গার্মেন্টস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আক্তার।  তিনি বলেন, ‘৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দেয়া হয়েছিলো এবং এর মধ্যে দুজন মারা গেছেন। সাত জন এখনো পলাতক। সোহেল রানা ছাড়া আর কেউ জেলে নেই। বাকী সব জামিনে আছেন। এসব মামলার বিচার কবে হবে জানিনা’।  ২০১৬ সালে ঢাকার আদালতে যে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিলো তাদের ৩৮ জনের বিরুদ্ধেই খুনের অভিযোগ আনা হয়েছিলো। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলো পোশাক খাতে কর্মরত ১ হাজার ১৩৬জন শ্রমিক। এর মধ্যে ২৯১ জনকে ডিএনএ নমুনা রেখে দাফন করা হয়েছিলো জুরাইন কবরস্থানে। আহত হন আরও অন্তত ১ হাজার ১৬৯ জন।  তখন জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিলো ২ হাজার ৪৩৮ জনকে। পরে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪টি – কিন্তু এর মধ্যে ১১টি হয় শ্রম আদালতে। বাকী তিনটির মধ্যে দুটিই হত্যা মামলা।  বিচারে বিলম্ব কেন? কিন্তু এরপরেও বিচারে বিলম্ব কেন? জবাবে আদালতে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী খন্দকার আব্দুল মান্নান বলেন, কয়েকজন আসামীর আবেদনের হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছিলো উচ্চ আদালত।  তিনি বলেন, ‘আটজন হাইকোর্টে গিয়েছিলো। পরে ছ’মাস করে দু দফায় স্থগিতাদেশ এসেছিলো। এরপর সাতজনের আর কোন স্থগিতাদেশের কাগজ আমরা পাইনি। একজনের ১২ই মে পর্যন্ত স্থগিতাদেশ আছে। সেটি শেষ হয়ে গেলে ১৬ই মে তারিখ থেকে শুরু হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মামলাটি করার চেষ্টা করবো আমরা’।  ওদিকে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থতা বা সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে ব্যর্থতাসহ বেশ কটি অভিযোগে শ্রম আদালতে যে ১১ টি মামলা হয়েছে সেগুলোরও তেমন কোন অগ্রগতির তথ্য জানাতে পারেনি শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তর।  অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক সামছুজ্জামান ভুঁইয়া শুধু বলেছেন, মামলাগুলো এগুলো বিচারাধীন আছে। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা ভিন্ন মামলায় সাজা হয়েছে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ও তার মা মর্জিনা বেগমের।