রাজধানীতে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাস নৈরাজ্যে জড়িত

রাজধানীতে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাস নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলায় জড়িত বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সড়ক নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ দাবি করেন।  এ সময় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আমরা এসব ঘটনাকে দুর্ঘটনা নয় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলতে চাই। কেননা আমাদের সড়কের সমস্ত অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রেখে নৈরাজ্যকর পরিবেশে আমাদের যাতায়াত করতে বাধ্য করা হচ্ছে।   নগরীর প্রতিটি বাস-মিনিবাস-এর ব্যবসা মূলত চালকরা নিয়ন্ত্রণ করছে। চুক্তিভিত্তিক ইজারায় মালিক তার বাসটি চালকের হাতে তুলে দিয়েছে ফলে চালক যাত্রী ধরার জন্য বাসে বাসে ভয়ংকর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এহেন পরিস্থিতিতে বাস চালাতে গিয়ে বাসের নিচে কে গিয়ে পড়ল বা কার হাত বা পা গেল তা দেখার সময় নেই চালকদের।  আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রেজাউল হক, ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, মোবাশ্বের হোসেন, ইকবাল হাবিব।  এ সময় তারা বলেন, রাজধানীসহ সারাদেশে গণপরিবহনে নৈরাজ্য চলছে বাসে বাসে রেষারেষি করে বেপরোয়া চলাচল ও পাল্লাপাল্লির কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে যাত্রীরা। যত্রতত্র বাস থামানো রাস্তার মাঝ পথে গতি কমিয়ে চলন্ত বাসে যাত্রী উঠা-নামা করানো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন রাস্তার মোড়ে বাস থামিয়ে যাত্রী উঠানো নামানো যাত্রী ধরার জন্য বাসে বাসে ভয়ংকর প্রতিযোগিতা অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা ঢাকার গণপরিবহনে নিত্যদিনের চিত্র।  সম্প্রতি সরকারি তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনায় সারাদেশ কেঁদে উঠলেও প্রতিদিন বাংলাদেশ সড়ক-মহাসড়কে ঝরছে কমপক্ষে ৬৪টি প্রাণ। প্রতিদিন আহত ও পঙ্গুত্বের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে ১৫০ এর বেশি মানুষ। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা সড়কে শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে বলেও দাবি করেন তারা।  বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সমীক্ষায় দেখা গেছে বর্তমানে সারাদেশে নিবন্ধিত ৩১ লাখ যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনিবন্ধিত ভুয়া নামজারি ও অযান্ত্রিক যান মিলে প্রায় ৫০ লক্ষ যানবাহন রাস্তায় চলছে যার ৭২ শতাংশই ফিটনেস অযোগ্য  অন্যদিকে সারাদেশে ৭৯ লক্ষ চালকের মধ্যে বিআরটিএ লাইসেন্স আছে মাত্র ১৬ লক্ষ চালকের হাতে। বক্তারা আরও বলেন, রাজধানীতে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাস ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে বেপরোয়া চলাচল করে ফলে এসব বাসে দুর্ঘটনায় কারো হাত, কারো পা, কারো মাথা, কারো জীবন চলে যাচ্ছে।  সংগঠনের সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ সেলের তথ্যমতে, সারাদেশে জানুয়ারি ২০১৮ থেকে ২০ এপ্রিল ২০১৮ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৪১ জনের প্রাণহানি ও ৫ হাজার ৪৭৭ জন আহত হয়েছে। পঙ্গু হয়েছে ২৮৮ জন।  তারা বলেন, বিআরটিএ ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে তথাকথিত সনাতন পদ্ধতিতে জরিমানা আদায়ে ব্যস্ত। ট্রাফিক পুলিশ পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে চাঁদাবাজি টোকেনবাজি জরিমানা আদায় ও অর্থ আত্মসাতে মেতে উঠেছে।  প্রকৃত মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে কোণঠাসা করে সরকারের লেজুড়ভিত্তিক গুটি কয়েক সংগঠন এই সেক্টরের মালিক শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের পরিবর্তে চাঁদাবাজি পারমিট বাণিজ্য কর্তৃত্ব জাহির ক্ষমতার প্রদর্শনে ব্যস্ত রয়েছে।  দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়:  নগরীতে বাসে বাসে প্রতিযোগিতা বন্ধে কোম্পানিভিত্তিক একই কালারের বাস সার্ভিস চালু করা, উন্নত বিশ্বের আদলে আমলাতন্ত্রের বাইরে এসে পেশাদারিত্ব সম্পন্ন গণপরিবহন সার্ভিস অথরিটির নামে একটি টিম গঠন করা, ট্রাফিক বিভাগের কার্যক্রম জবাবদিহিতার আওতায় আনা, চালকের হাতে দৈনিক জমাভিত্তিক বাস ইজারা দেয়া বন্ধ করা, বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা জনবান্ধব করতে হবে, ট্রাফিক পুলিশের মামলার জরিমানা সরাসরি ব্যাংকে জমা দেয়ার বিধান নিশ্চিত করতে হবে, সড়কে চাঁদাবাজি টোকেন বাণিজ্য দখলবাজি বন্ধ করতে হবে।  এছাড়া পেশাদারিত্ব ও কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন লোকজন নিয়ে পুনর্গঠন করতে হবে, ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি বন্ধ যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে, পরিবহনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যাত্রী সাধারণের অভাব অভিযোগ তুলে ধরা ও মত প্রকাশের স্বার্থে যাত্রী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।