ধারাবাহিকভাবে ‘ব্যর্থ’ ঢাকা মহানগর বিএনপি

২০১৩ সালে মার্চ ফর ডেমোক্রেসি, ২০১৫ সালে তিন মাসের অবরোধ, চলতি বছরের খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন–সব ক’টিতেই কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটি। ‘কর্মসূচিতে গতি ফিরবে’ ভেবে ঢাকা মহানগর বিএনপিকে উত্তর-দক্ষিণে ভাগ করার পরও মাঠে নামার চ্যালেঞ্জে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছেন নেতারা। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দলকে গোছানো, কর্মীদের মনোবল চাঙা করা এবং পুনরায় আন্দোলনের জন্য মাঠে নামার কৌশল ঠিক করার ক্ষেত্রে মহানগর বিএনপির নেতারা কোনও ভূমিকাই রাখতে পারছেন না।  গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর বিএনপিকে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই ভাগে ভাগ করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। বুধবার (১৮ এপ্রিল) কমিটি পুনর্গঠনের এক বছর হলো। যে আশায় ঢাকা মহানগর বিএনপিকে উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করা হয়, গত এক বছরে তা বিএনপিতে হতাশার জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থায় দলের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন মহানগর বিএনপি নেতারা।  দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিগত আট বছরে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঢাকা মহানগর বিএনপি ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ। গুম-খুন ও মামলার ভয়ে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এদিকে, তাদের থেকে কোনও দিকনির্দেশনা না পেয়ে মাঠের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।  বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অনেক প্রত্যাশার জায়গা থেকেই মির্জা আব্বাসকে সরিয়ে ঢাকা দক্ষিণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হাবিব-উন নবী সোহেলকে। যুগ্ম মহাসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পরও তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছিলেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। অথচ দলীয়প্রধানের প্রত্যাশার সিকিভাগও পূরণ করতে পারেননি সোহেল।  বিএনপি সূত্র জানায়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করতে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ওই সময় ঢাকা মহানগর বিএনপির দায়িত্বে ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা ও আবদুস সালাম। তাদের ব্যর্থতার কারণে পরের বছর ১৮ জুলাই মির্জা আব্বাস ও হাবিব-উন নবী খান সোহেলের নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি তিন মাসের অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। কিন্তু এ কর্মসূচি সফল করার ক্ষেত্রে আহ্বায়ক কমিটি কোনও ভূমিকাই রাখতে পারেনি।  সূত্র আরও জানায়, এরপর ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলনে গতি সঞ্চার করতে ঢাকা মহানগর বিএনপিকে দুই ভাগ করা হয়। হাবিব-উন নবী খান সোহেল ও কাজী আবুল বাশারকে যথাক্রমে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং আবদুল কাইয়ুম ও আহসান উল্লাহকে ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয়।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির ঢাকা উত্তরের সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম জাপানি নাগরিক তাভেল্লা সিজার হত্যা মামলার আসামি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে রয়েছেন। আর খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের আগে থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন হাবিব-উন নবী খান সোহেল। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিলেও খালেদা জিয়ার মুক্তির কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। তবে ৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়ার সময় এবং ১৪ জানুয়ারি প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপির অনশন কর্মসূচিতে তাকে দেখা গিয়েছিল।  হাবিব-উন নবী খান সোহেলের আত্মগোপন নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেক সমালোচনা রয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গ্রেফতারের ভয় নিয়েও দলীয় কার্যালয়ে গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে অবস্থান নিয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন ও কার্যালয়ের সামনে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। আর মহানগরের মতো কমিটির সভাপতি হয়েও হাবিব-উন নবী খান সোহেল আত্মগোপনে রয়েছেন। এতে অন্য নেতাকর্মীরা আন্দোলন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।  সোহেলের আত্মগোপন প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম  বলেন, ‘গত ৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়া আদালতে যাওয়ার সময় নেতাকর্মীদের নিয়ে গাড়িবহরে ছিলেন তিনি। এ ছাড়া, তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন।’  গত ৮ জানুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের সাজা হওয়ায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন খালেদা জিয়া। এরপর থেকে দলের চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসছে দলটি। অভিযোগ আছে, এ আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় রয়েছে ঢাকা মহানগর বিএনপি। কেবল প্রেস রিলিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে তাদের কর্মসূচি পালন।  ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ কমিটির নেতারা বলছেন, পুলিশি হামলা-মামলার কারণে নেতাকর্মীরা ঘরেই থাকতে পারছেন না। তারপরও তারা দলের প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে এটা ঠিক, তারা বড় আকারে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছেন না।  ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ  বলেন, ‘আমরা হয়তো হাজার হাজার নেতাকর্মী নিয়ে দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় আন্দোলন করতে পারিনি। কিন্তু প্রতিটি থানায় শত শত নেতাকর্মী নিয়ে ম্যাডামের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছি। এসবের প্রেস রিলিজ সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। আমরা কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে ফটোসেশন করে ছবি পাঠাই না।’  ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর বিএনপিকে উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করে আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু গত এক বছরেও এ কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি। এ কমিটি রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের কমিটিও ঘোষণা করেনি।  এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ বলেন, ‘৬০ জনকে দিয়ে আংশিক কমিটি দেওয়া হয়েছে। এরপর আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা তৈরি করে ম্যাডামের কাছে দিয়েছিলাম। তখন তিনি বলেছিলেন, আরও কয়টা দিন পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবেন। এরপর বিভিন্ন কারণে তা আর ঘোষণা করা হয়নি।’  তিনি আরও বলেন,  ‘২৬টি থানা নিয়ে মহানগর উত্তরের কমিটি। আমরা প্রায় ২০টি থানায় পাঁচজনের কমিটির তালিকা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু এরমধ্যে নেত্রীকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই এখন আমরা চাইলেও কমিটি দিতে পারছি না।’  ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘৭০ জনকে দিয়ে আংশিক কমিটি দেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রস্তুত করা আছে। তবে দেশনেত্রী কারাগারে থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া, থানা-ওয়ার্ডের কর্মিসভা করে কমিটি প্রস্তুত করা হচ্ছে।’