সাভারের নিটার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিনা নোটিশে ৪ জনকে চাকরিচ্যুতির অভিযোগ 

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালিত সাভারের জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (নিটার) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল অফিসারসহ ৪ জনকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার এই অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগীরা। রয়েছে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও। বিষয়টি নিয়ে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই অধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রার বলছেন, বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগেই বরখাস্ত করা হয়েছে চার জনকে। চাকরিচ্যুত চার কর্মকর্তা হলেন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মো. নাজমুল হাসান, কারিগরি কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম, অ্যাকাউন্টস বিভাগের প্রধান রুহুল কেস্ত ও আইটি অফিসার তাসনিমুল।
ভুক্তভোগীরা জানান, নিটারের অধ্যক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান এবং রেজিস্ট্রার কাজী আন্দালিব আমিনের স্বেচ্ছাচার ও অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আবেদন করেছেন তারা। এর মধ্যে মো. নাজমুল হাসান ও করিগরি কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম আশুলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নাজমুল হাসান বলেন, ‘২০১৭ সালের ২৩ মার্চ রেজিস্ট্রার আন্দালিব আমিন আমাকে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে অফিসে ডেকে নেন। সেখানে সবার সামনে আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে অফিস থেকে বের করে দেন অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান। অথচ তাদের নির্দেশেই আমি সব কাজ করেছি। আবার আমার কাজ ঠিক হয়নি বলে আমাকে দুবার প্রহসনমূলক কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠানো হয়েছে।’
নাজমুল হাসান বলেন, ‘ওইদিন আমাকে বের করে দেওয়ার পর আমার পাওনা টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে আবার অফিসে ডেকে আনা হয়। সে সময় আমাকে দিয়ে অব্যাহতিপত্র লিখিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এখনও আমার পাওনা এক লাখ ৬০ হাজার ৩০৮ টাকা দেওয়া হয়নি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাজমুলকে অভিযুক্ত করে দুই দফায় চিঠি দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। নাজমুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তে কমিটিও করে নিটার। কমিটির ২০১৭ সালের ৮ মে দাখিল করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নাজমুল যে টাকা দাবি করেছেন, তার মধ্যে এক লাখ ৪৭ হাজার ৩১০ টাকার সত্যতা খুঁজে পেয়েছে কমিটি। বাকি ১২ হাজার ৫৯৮ টাকার পাকাপোক্ত কোনও প্রমাণ পায়নি কমিটি। নাজমুলকে পাওনা পরিশোধ করে ওই ১২ হাজার ৫৯৮ টাকা আদায় করা যেতে পারে বলেও সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। তবে নাজমুল বলছেন, টাকা এখনও পরিশোধ করা হয়নি।
আরেক ভুক্তভোগী নিটারের টেকনিক্যাল অফিসার মো. আরিফুল ইসলাম অভিযোগ জানিয়ে বলেন, ‘গত ১৩ মার্চ অধ্যক্ষ হঠাৎ মিটিং ডেকে সবার সামনে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে অফিসের নিরাপত্তারক্ষীদের দিয়ে আমাকে বের করে দেন তিনি। এর কারণ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বা উপস্থিত কেউ আমাকে কিছুই জানাননি। পরদিন অফিসের গাড়িতে করে অফিসে গেলেও গেট থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, আমাকে ঢুকতে নিষেধ করেছেন অধ্যক্ষ। এখনও কোনও নোটিশ বা অব্যাহতিপত্র আমাকে দেওয়া হয়নি।’ অফিস থেকে পাওনা টাকাও এখনও পাননি বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় আরিফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচর্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিন ও নিটারের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। গত ১৯ মার্চ আশুলিয়া থানায় একটি জিডিও করেন তিনি।
ভুক্তভোগী নিটারের অ্যাকাউন্টস বিভাগের প্রধান রুহুল কেস্তর অভিযোগ আরও পুরনো। তার বিরুদ্ধে যে অনিয়ম করা হয়েছে, তার প্রতিকার চেয়ে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রীর কাছে তিনি আবেদন করেন ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট। আবেদনে তিনি বলেছেন, ২০১৬ সালের ৩০ জুন অধ্যক্ষ ড. মিজানুর রহমান ও সহকারী রেজিস্ট্রার (বর্তমানে রেজিস্ট্রার) কাজী আন্দালিব আমিন যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ষড়যন্ত্র করে একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে অব্যাহতি প্রদানের চিঠি দেন।
রুহল কেস্ত বলেন, ‘আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। আমার মতো নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন।’
আইটি অফিসার তাসনিমুল বলেন, ‘চাকরি ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছি অধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারের কারণে। আমার মতো আরও অনেকেই আছেন যারা তাদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন। তাদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। তারাও কেউ কিছু করতে পারেননি।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিটারের অধ্যক্ষ ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আরিফুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। গভর্নিং বডি দুই মাস তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রবেশন পিরিয়ডে রুহুল কেস্তর অদক্ষতার কারণে গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নাজমুল হোসাইনের বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, ‘তিনি রিজাইন দিয়ে চলে গেছেন। তদন্তে তার অসততা পাওয়া গেছে।’ পাওনা টাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চুরি করে ধরা পড়ার কারণে তিনি মাফ চেয়ে রিজাইন দিয়ে চলে গেছেন।’
নিটারের রেজিস্ট্রার কাজী আন্দালিব আমিন বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপ বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইনস্টিটিউটের নিয়ম অনুযায়ীই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গভর্নিং বডিই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশিক্ষক আরিফকে চিঠি দিয়েছি। সেই চিঠির কপিও আমাদের কাছে আছে। ডাকযোগে চিঠি পাঠানোর বিষয়টিও আমরা তাকে জানিয়েছি।’
নিটার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে জিডি দায়েরের বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী আন্দালিব আমিন বলেন, ‘তাদের নামেও জিডি করা হয়েছে। এটি একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ দুঃখজনক। কারণ তাদের সঙ্গে আমাদের তো পেশাগত কোনও বৈরিতা নেই।’